রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
উচ্চ নির্মাণ ব্যয় ও ঋণের সুদে থমকে যাচ্ছে আবাসন প্রকল্প এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপ ২০২৬: বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ক্রীড়া বিকাশে সায়েম সোবহান আনভীরের উদ্যোগ বসুন্ধরা শুভসংঘের সহায়তায় ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ৪০ নারীর বিগত সরকার একটি রাষ্ট্রের পরামর্শে এ জাতিকে মেধাশূন্য করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল- এস এম জিলানী আইসিসিবিতে এক ছাদের নিচে গাড়ির বিশাল সমাহার ইউনুস গং এর ফাঁসি চাই লেখা পোস্টার লাগানোর অভিযোগে কোটালীপাড়ায় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আটক নারীর সম্মান ও ক্ষমতায়ন বাড়াতে ফ্যামিলি কার্ড দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী- এস এম জিলানী ১৯৫৮ সালের সামরিক অভ্যুত্থান: যে পথে গণতন্ত্র থেকে দূরে সরে যায় পাকিস্তান রাজউকের আবাসন প্রকল্পে কাজের ধীরগতি, বাড়ছে অনিয়মের অভিযোগ তরুণদের মাঠমুখী করতে বসুন্ধরার উদ্যোগ, আসছে ইউনিভার্সিটি কাপ

উচ্চ নির্মাণ ব্যয় ও ঋণের সুদে থমকে যাচ্ছে আবাসন প্রকল্প

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ২.৩৪ পিএম
  • ৫ Time View
7

বিশেষ প্রতিনিধিঃ

দেশের আবাসন খাতে একদিকে নির্মাণসামগ্রীর লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে উচ্চ সুদে গৃহঋণ ও ফ্ল্যাটের ক্রেতা সংকট—সব মিলিয়ে গভীর চাপ তৈরি হয়েছে। নতুন প্রকল্প গ্রহণে অনীহা বাড়ার পাশাপাশি চলমান অনেক প্রকল্পের কাজও থমকে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নির্মাণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে, সংকুচিত হচ্ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ। এ পরিস্থিতিতে আবাসন খাতকে ঘুরে দাঁড় করাতে গ্রাহকপর্যায়ে গৃহঋণের সুদ ৫ শতাংশে নামানো, আবাসন ব্যবসায়ীদের এক অঙ্কের সুদে ঋণ দেওয়া, ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয় কমানো এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল। তাঁর আশঙ্কা, কার্যকর উদ্যোগ না নিলে এ খাতের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

কৃষিবিদ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং গ্লোরিয়াস ল্যান্ডস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডের চেয়ারম্যান ড. আলী আফজাল আবাসন খাতের বর্তমান সংকট, ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা এবং সাধারণ মানুষের জন্য আবাসন সহজলভ্য করার বিষয়ে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, আবাসনকে কেবল ব্যবসা হিসেবে বিবেচনা না করে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ এবং দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি আবাসন খাতের সংকটকে আরও গভীর করেছে বলে মনে করেন রিহ্যাব সভাপতি। তাঁর দাবি, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নির্মাণসামগ্রীর দাম প্রায় ৩১ শতাংশ বেড়েছিল। পরবর্তী সময়ে আরও ১২ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধির হার প্রায় ৪৩ শতাংশে পৌঁছেছে। কিন্তু ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ফ্ল্যাটের বিক্রয়মূল্য বাড়ানো যাচ্ছে না। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।

ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। ক্রেতারা কয়েক বছর আগে ফ্ল্যাট কেনার চুক্তি করেন এবং কিস্তিতে অর্থ পরিশোধ করেন। চুক্তি করার পর নির্মাণসামগ্রীর দাম ও অন্যান্য ব্যয় বেড়ে গেলেও পূর্বনির্ধারিত মূল্যে ফ্ল্যাট হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা থাকে। এ অবস্থায় বাড়তি ব্যয়ের চাপ ব্যবসায়ীদের বহন করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, বড় আবাসন প্রতিষ্ঠানের কিছু আর্থিক সক্ষমতা থাকলেও ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে দীর্ঘদিন এ ধরনের চাপ সামাল দেওয়া কঠিন। এরই মধ্যে কিছু প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মীসংখ্যা কমেছে।

ফ্ল্যাটের চাহিদা কমে যাওয়ার পেছনে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, ঋণের উচ্চ সুদ এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন রিহ্যাব সভাপতি। তাঁর মতে, মানুষের ফ্ল্যাট কেনার আগ্রহ একেবারে হারিয়ে যায়নি; বরং বর্তমান বাজারদরে ফ্ল্যাট কেনা অনেকের সামর্থ্যের বাইরে চলে গেছে।

তিনি বলেন, উচ্চ সুদে গৃহঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কেনা মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় অনেকেই বড় অঙ্কের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।

ড. আলী আফজালের ভাষ্য, করোনাকাল থেকেই আবাসন খাতের সংকট বাড়তে শুরু করে। পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের পরিবেশকে প্রভাবিত করেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও বিনিয়োগ করা অর্থ এবং অর্জিত মুনাফা ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আবাসন খাতের সংকট শুধু ফ্ল্যাট নির্মাতা বা বিক্রেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, ফার্নিচারসহ প্রায় ২৭০টি সংযুক্ত শিল্প জড়িত বলে জানান রিহ্যাব সভাপতি। এসব শিল্পের পণ্যের অন্যতম বড় ক্রেতা আবাসন খাত। ফলে ফ্ল্যাট নির্মাণ কমে গেলে এসব পণ্যের চাহিদা ও বিক্রিও কমে যায়।

তিনি বলেন, নির্মাণ কার্যক্রম সংকুচিত হলে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উৎপাদন ও বিক্রি কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকঋণ পরিশোধেও চাপ তৈরি হতে পারে। এভাবে আবাসন খাতের মন্দা বৃহত্তর অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে।

ড. আলী আফজালের দাবি, দেশের আবাসন খাতে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ কর্মরত। প্রকল্প কমে যাওয়া ও নির্মাণকাজ বন্ধ হওয়ার কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই হচ্ছে। তবে এ পর্যন্ত কতজন কর্মী চাকরি হারিয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তাঁর কাছে নেই বলে জানান তিনি।

ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে নিবন্ধন ও সংশ্লিষ্ট কর-ফি বড় আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন ড. আলী আফজাল। তাঁর ভাষ্য, বর্তমানে ফ্ল্যাট নিবন্ধন এবং সংশ্লিষ্ট কর ও ফি মিলিয়ে ব্যয় প্রায় ১১ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ফ্ল্যাটের মূল দামের সঙ্গে এই অতিরিক্ত অর্থ যোগ হওয়ায় অনেক ক্রেতার জন্য বাড়ি কেনা আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, নিবন্ধন ব্যয় বেশি হওয়ায় অনেকে ফ্ল্যাট কেনার পরও নিবন্ধন প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেন। প্রকৃত বাজারমূল্যের ভিত্তিতে নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা এবং নিবন্ধন ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা গেলে ক্রেতারা উপকৃত হবেন। পাশাপাশি নিবন্ধনের সংখ্যা বাড়লে সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।

আবাসন প্রকল্পের অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করার ওপরও গুরুত্ব দেন রিহ্যাব সভাপতি। জমি ও ভবনের নকশা অনুমোদনসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা পুরোপুরি ডিজিটাল করার প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়মের কারণে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বাড়ে। এতে নির্মাণ ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়, যার চূড়ান্ত চাপ বহন করতে হয় ফ্ল্যাটের ক্রেতাদের।

মধ্যবিত্তের আবাসন সমস্যা সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি গৃহঋণের সুদহার ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছেন ড. আলী আফজাল। তাঁর মতে, ঋণের সুদ কমানো গেলে ফ্ল্যাট কেনার সামর্থ্য বাড়বে এবং আবাসন খাতেও নতুন করে চাহিদা তৈরি হবে।

তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আর্থসামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে গৃহঋণের সুদহার নির্ধারণ করা যেতে পারে। ঢাকায় তুলনামূলক বেশি সুদে, জেলা শহরে আরও কম সুদে এবং উপজেলা ও গ্রামাঞ্চলে প্রায় ১ শতাংশ সুদে গৃহঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলে রাজধানীর ওপর জনসংখ্যা ও আবাসনের চাপ কমানো সম্ভব হবে।

একই সঙ্গে আবাসন ব্যবসায়ীদের জন্য এক অঙ্কের সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থাও প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, নির্মাণব্যয় বৃদ্ধির সময়ে স্বল্প সুদে অর্থায়ন পাওয়া গেলে প্রতিষ্ঠানগুলো চলমান প্রকল্প শেষ করতে এবং নতুন প্রকল্প হাতে নিতে উৎসাহিত হবে।

ড. আলী আফজাল বলেন, আবাসন মানুষের মৌলিক প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই এ খাতকে শুধু মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা হিসেবে না দেখে সাধারণ মানুষের আবাসন নিশ্চিত করার বৃহত্তর লক্ষ্য সামনে রেখে নীতিসহায়তা দেওয়া উচিত।

সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের প্রস্তাব দিয়েছেন রিহ্যাব সভাপতি। তাঁর মতে, নতুন আবাসন গড়ে তুলতে নির্বিচারে কৃষিজমি ব্যবহার না করে অব্যবহৃত সরকারি জমিকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। সরকারি জমি ব্যবহারের সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা ও বিনিয়োগ যুক্ত করা গেলে তুলনামূলক সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণের সুযোগ তৈরি হবে।

তিনি আরও বলেন, শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক আবাসন পরিকল্পনা দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রাজধানীর আশপাশের জেলা ও উপজেলা থেকে যাতায়াত সহজ করতে উন্নত সড়ক যোগাযোগ গড়ে তুলতে হবে। কর্মস্থলে যাতায়াতের সুবিধা বাড়লে ঢাকার বাইরে বসবাসের আগ্রহ বাড়বে এবং রাজধানীর আবাসন চাহিদার ওপর চাপ কমতে পারে।

আবাসন খাতের সংকট কাটিয়ে উঠতে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশে সরকারের কার্যকরভাবে দাঁড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করেন ড. আলী আফজাল। তাঁর মতে, ঋণ পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ এবং স্বল্প সুদে অর্থায়নের বিষয়ে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর সুফল প্রকৃতপক্ষে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, নির্মাণ ব্যয়, গৃহঋণের সুদ এবং ফ্ল্যাট নিবন্ধন ব্যয়—এই তিন ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া গেলে আবাসন খাতে নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি সেবায় দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।

রিহ্যাব সভাপতির মতে, সরকার, ব্যাংক ও আবাসন ব্যবসায়ীদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন। পরিকল্পিত নীতিসহায়তা ও সাশ্রয়ী অর্থায়নের মাধ্যমে আবাসন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে ফ্ল্যাটের বাজারে চাহিদা বাড়বে, সংযুক্ত শিল্পগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Advertise

Ads

Address

Office : Sheikh Fazlul Haque Moni Stadium (2nd floor), Gopalganj-8100 Mobile: 01712235167, Email: kalerkhabor24.com@gmail.com
© All rights reserved 2022

Design & Developed By: JM IT SOLUTION