কালের খবর ডেক্সঃ
আবাসন সংকট, অচল ফ্যান, সুপেয় পানির অভাব এবং জরাজীর্ণ ওয়াশরুম-এমন নানা সমস্যায় দীর্ঘদিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজের পাঁচশতাধিক শিক্ষার্থী। বারবার অভিযোগ জানানোর পরও দৃশ্যমান সমাধান না হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন তারা।ইতোমধ্যে দাবি আদায়ে স্মারকলিপি দেওয়ার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আরও কঠোর আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজের ছাত্রী হোস্টেলে প্রায় ২২০-২৪০ জনের আবাসনের ব্যবস্থা থাকলেও বর্তমানে সেখানে প্রায় ৩৫০ জন শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। ফলে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের প্রথম বর্ষের অনেক শিক্ষার্থীকে কমনরুমে গণরুম তৈরি করে থাকতে হচ্ছে। একটি কক্ষে ২২ থেকে ২৩ জন শিক্ষার্থীকে রাখা হলেও সেখানে পর্যাপ্ত ফ্যান নেই। অন্য কক্ষগুলোরও অধিকাংশ ফ্যান ও বৈদ্যুতিক বাল্ব নষ্ট কিংবা ত্রুটিপূর্ণ । বাধ্য হয়ে নিজেরা লাইট লাগিয়ে নিয়েছি। এতে প্রচণ্ড গরমে স্বাভাবিকভাবে বসবাস ও পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান প্রথম বর্ষের ছাত্রী শাফিকা ইসলাম।
শুধু আবাসন সংকটই নয়, বয়েজ ও গার্লস উভয় হোস্টেলেই সুপেয় পানির সংকট রয়েছে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের। পাশাপাশি ছয়তলা ভবনের প্রতিটি ফ্লোরে থাকা ওয়াশরুমগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় পাইপ ফেটে পানি ও মলমূত্র চুইয়ে পড়ছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে বলে জানান শিক্ষার্থীরা।
এসব সমস্যার সমাধানের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) কলেজের অধ্যক্ষের কাছে একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন হোস্টেলে বসবাসরত শিক্ষার্থীরা। স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, আগামী সোমবার (১০ জুলাই)-এর মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে মঙ্গলবার (১১ জুলাই) থেকে একাডেমিক ভবন অবরোধ, ক্লাস ও ওয়ার্ড বর্জনসহ ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করা হবে।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, গত ৩০ জুন কলেজের একাডেমিক ভবনের হলরুমে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের নেতৃত্বে কলেজ প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে এক দিনের মধ্যে জরুরি সমস্যাগুলোর সমাধান এবং অন্যান্য সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তার বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তৃতীয় ও চতুর্থ বর্ষের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীদের সাথে কথা হলে তারা বলেন, দুইটি হোস্টেলই বাইরের থেকে দেখতে ফিটফাট। কিন্তু ভিতরে সদরঘাট।শুধু পরিকল্পনার অভাবে এমন অবস্থার সৃস্টি বলে মনে হয়।
চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ইস্তিয়াক রহমান ইশান বলেন, কলেজ কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানোর পরও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাই সাধারণ শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার থেকে একাডেমিক শাটডাউন ঘোষণা দিয়ে চার শতাধিক শিক্ষার্থী হোস্টেল ত্যাগ করেছে।

তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এম বি আসিফ খান বলেন, হোস্টেোলের অব্যবস্থাপনার করনে অনেক শিক্ষার্থী হল ত্যাগ করেছে। কর্তৃপক্ষকে বার বার বলা হলেও কার্যত কোন ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত নিতে পারেনি। আমরা চাই কলেজ কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনবেন। তা না হলে আমরা কঠোর কর্মসূচী দিতে বাধ্য হবো।
পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী জাহিমুর রহমান জিসান বলেন, বয়েজ ও গার্লস হোস্টেলের ওয়াশরুমগুলো ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে আছে। কিছু কিছু জায়গায় পাইপ থেকে মলমূত্র চুইয়ে পড়ছে। এই পরিবেশে সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়বে। হোস্টেল সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে আগামী সপ্তাহ থেকে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নুসরাত শশি বলেন, হোস্টেলের বর্তমান পরিবেশে পড়াশোনা করা খুবই কষ্টসাধ্য। ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি শিক্ষার্থী থাকায় ঠিকমতো ঘুমানো যায় না। ফলে পড়াশোনার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আমরা দ্রুত সমস্যার সমাধান চাই।
অভিযোগের বিষয়ে গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. গোলাম মোর্শেদ মোল্লা বলেন, লেডিস হোস্টেলে আসন রয়েছে ২৪০টি। কিন্তু বর্তমানে সেখানে ৩৫০-এরও বেশি ছাত্রী রয়েছে। মেডিকেল কলেজগুলোতে মেয়েদের ভর্তি বেশি হওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। আপাতত কমনরুমগুলোকে গণরুম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ছেলে এবং মেয়েদের হোস্টেলে যেসকল সমস্যা দেখা দিয়েছে সেগুলো ইতোমধ্যে সমাধানে কাজ চলমান রয়েছে। পানিপড়া, ফ্যান, লাইট এগুলো লাগানো হচ্ছে। ইতোমধ্যে উর্ব্ধতন কতৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে ক্যাম্পাসের মধ্যে একটি ভবন ছাত্রীদের থাকার জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।তাতে নারী শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা দুর হবে।আশাকরি আগামী শ্রক্রবারের মধ্যে সমস্যাগুলো সমাধানে পদক্ষেপ কার্যকর হবে।
শিক্ষার্থীদের দাবি, একটি মেডিকেল কলেজে ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের এমন অস্বাস্থ্যকর ও অনিরাপদ পরিবেশে বসবাস করতে হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত আবাসন সংকট নিরসন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, নষ্ট ফ্যান ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম মেরামত এবং ওয়াশরুম সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
উল্লেখ্য ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে ৫১ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে গোপালগঞ্জ মেডিকেল কলেজ। পরে ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষে আসন সংখ্যা ৬৫ এবং ২০২৩ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ১২৫ জনে উন্নীত হয়। শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য ছয়তলা বিশিষ্ট দুটি হোস্টেল নির্মাণ করা হলেও শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়লেও আবাসন সুবিধা সেই হারে বৃদ্ধি পায়নি। এছাড়া রয়েছে দুটি ছয়তলা ইন্টার্ন হোস্টেল।
Design & Developed By: JM IT SOLUTION