“বিএসসি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রিধারী এই তরুণ চাকরির মোহ ত্যাগ করে প্রতিদিন নেমে পড়েন মানুষের সেবায়। ভাঙা রাস্তা সংস্কার, টিউবওয়েল মেরামত, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, বৃক্ষরোপণ সবই করছেন নিজের অর্থ, শ্রম ও ভালোবাসা দিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোটি মানুষের ভালোবাসা পেলেও তার কাছে সবচেয়ে বড় অর্জন মানুষের দোয়া ও ভালোবাসা।”
রেজোয়ান চৌধুরী, কালের খবরঃ
স্বার্থের এই প্রতিযোগিতামূলক সময়ে, যখন অধিকাংশ মানুষ নিজের জীবন ও পরিবারের গন্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তখন গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার এক তরুণ নীরবে গড়ে চলেছেন মানবসেবার এক অনন্য ইতিহাস। কোনো সরকারি বরাদ্দ নয়, কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নয়, কোনো প্রতিষ্ঠানের সহায়তাও নয়,শুধু মানুষের প্রতি ভালোবাসা, দায়বদ্ধতা এবং নিজের উপার্জিত অর্থকে সম্বল করে প্রতিনিয়ত তিনি কাজ করে চলেছেন সাধারণ মানুষের জন্য।
তিনি হলেন,তপন ঘোষ। মুকসুদপুর উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের এক সুপরিচিত ব্যবসায়ী ঘোষ পরিবারের সন্তান। বয়স ৩৫ বছর। এলাকাজুড়ে তিনি এখন এক নামেই পরিচিত ‘মানবতার ফেরিওয়ালা তপন’। কারণ, যেখানে ভাঙা রাস্তা মানুষের দুর্ভোগ বাড়ায়, যেখানে স্কুলের টিউবওয়েল নষ্ট হয়ে শিক্ষার্থীরা পানির কষ্ট ভোগ করে, যেখানে মসজিদ, মন্দির কিংবা মাদরাসার পরিবেশ অপরিচ্ছন্ন থাকে অথবা যেখানে একটি ছোট গর্ত প্রতিদিন দুর্ঘটনার কারণ হয় সেখানেই দেখা মেলে তপন ঘোষের।
তিনি কাউকে দোষারোপ করেন না আবার অভিযোগও করেন না। বরং নিজের অর্থে ইট, বালু, খোয়া, সিমেন্ট বা প্রয়োজনীয় মালামাল কিনে নিজেই কাজ শুরু করে দেন। কখনও বা শ্রমিক নিয়ে, কখনও আবার নিজ হাতে হাতুড়ি বা কোদাল চালিয়ে মানুষের কষ্ট লাঘব করে চলছেন।
সম্প্রতি সরেজমিনে মুকসুদপুর উপজেলার বণগ্রাম বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বাবার রেখে যাওয়া ‘ঘোষ মিষ্টান্ন ভান্ডার’-এ সাধারণ একজন দোকানির মতোই ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তপন ঘোষ। নিজেই দোকান পরিষ্কার করছেন, ক্রেতাদের আপ্যায়ন করছেন, হাসিমুখে মিষ্টি বিক্রি করছেন। তার মধ্যে নেই কোনো অহংকার, নেই উচ্চশিক্ষিত হওয়ার বাড়তি কোন ভাবও।
সাংবাদিক পরিচয় দিতেই মিষ্টি হেসে বলেন, ভাই আমি আবার কী অপরাধ করলাম? আমি তো শুধু ব্যবসা করি আর মানুষের কষ্ট কমানোর চেষ্টা করি। যেখানে সমস্যা দেখি, সেখানেই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে দিই। মানুষের মুখের হাসিই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।নির্ভয় দিতে শুরু হয় কথোপকোথন।

উচ্চশিক্ষা শেষে কর্পোরেট চাকরি, তারপর গ্রামে ফেরাঃ
তপন ঘোষ জানান, তার জন্ম ১৯৯১ সালের ১৬ মে। ২০০১ সালে বাড়ির পাশে ৪৮নং মহারাজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা শেষে ফরিদপুরের নগরকান্দার বনেশ্বরদী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ২০০৬ সালে এসএসসি এবং ২০০৮ সালে ফরিদপুর সরকারি ইয়াসিন কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ঢাকার বনানীতে অবস্থিত প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসি ইন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হয়ে ২০১৩ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
পড়াশোনা শেষে গাজীপুরের কোনাবাড়ীতে পিএন কম্পোজিট লিমিটেডে ল্যাব ডাইং বিভাগে চাকরি শুরু করেন। পরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় একটি স্বনামধন্য টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠানে ডাইং প্রোডাকশন বিভাগে যোগ দেন। কয়েক বছর চাকরি করলেও গ্রামের প্রতি টান এবং পরিবারের দায়িত্ব তাকে ফিরিয়ে আনে নিজের এলাকায়। ২০১৬ সালে চাকরি ছেড়ে তিনি বাবার ব্যবসায় যুক্ত হন।
ভিডিও বানাতে গিয়ে বদলে গেল জীবনের লক্ষ্যঃ
প্রথমদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের বিনোদনমূলক ভিডিও এবং বাজারদর নিয়ে ভিডিও তৈরি করতেন তপন। কিন্তু তাতে কাঙ্খিত সাড়া পাননি। তখন তার মাথায় আসে ভিন্ন একটি চিন্তা। মানুষের সমস্যাকে তুলে ধরা এবং সেই সমস্যার সমাধান করে দেখানো।
২০২৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বাবা নীলকণ্ঠ ঘোষের মৃত্যুর পর মানুষের জন্য আরও বেশি কিছু করার সংকল্প নেন তিনি। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ব্যবসা। বিকেল ৩ থেকে একটি ভ্যান নিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে মানুষের দুর্ভোগ খুঁজতে শুরু করেন। কোথাও রাস্তা ভেঙে গেছে, কোথাও কালভার্টের সংযোগ সড়ক দেবে গেছে, কোথাও বড় গর্তে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে,এসব দেখে আর বসে থাকতে পারেননি তিনি।
নিজের পকেটের টাকা খরচ করে নির্মাণসামগ্রী কিনে শুরু করেন সংস্কারকাজ। সেই কাজের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করতে থাকেন। মানুষের ভালোবাসায় তার ফেসবুক ও ইউটিউব প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে প্রায় ১৩ মিলিয়ন সাবস্ক্রাইবার এবং এক কোটিরও বেশি অনুসারী রয়েছে।
যেখানেই সমস্যা, সেখানেই তপনের উপস্থিতিঃ
তপন ঘোষ জানান, তার প্রথম বড় কাজ ছিল ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের দিগনগর ব্রিজের উত্তর পাশে একটি বড় গর্ত মেরামত করা। সেখানে প্রায়ই ছোট যানবাহন দুর্ঘটনায় পড়ত। তিনি নিজ উদ্যোগে আরসিসি ঢালাই করে গর্তটি সংস্কার করেন। এরপর একে একে গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর, নড়াইল এমনকি ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়ও জনকল্যাণমূলক কাজ করেছেন।
তিনি বলেন, আমি এখন আর হিসাব করি না কত টাকা খরচ হলো। যেখানে মানুষের কষ্ট দেখি, সেখানে কাজ করার চেষ্টা করি। কেউ ফোন করে সমস্যার কথা জানালেও চলে যাই। মানুষের উপকার করতে পারলে সেটাই আমার সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।

রাস্তা সংস্কারের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায়ও ব্যতিক্রমী উদ্যোগঃ
গত এক বছরে তিনি প্রায় আড়াই শতাধিক স্থানে রাস্তা মেরামত, কালভার্টের সংযোগ সড়ক সংস্কার, বাশেঁর সাঁকো, ঝোপঝাড় পরিষ্কার, স্কুল-কলেজ, মসজিদ, মন্দির ও মাদরাসার নষ্ট টিউবওয়েল মেরামত করেছেন।
এছাড়া চলতি বর্ষা মৌসুমে প্রায় পাঁচ শতাধিক আম, জাম, কাঁঠাল, আমলকী, হরিতকী, লটকন, করমচা, লেবু ও জামরুলসহ বিভিন্ন ফলদ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করেছেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নও দেখেন তিনি।
মানুষের মুখেই তপনের প্রশংসাঃ
মহারাজপুর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা সিরাজ মুন্সী বলেন, তপন ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ও ভদ্র ছেলে। উচ্চশিক্ষিত হওয়ার পরও নিজের হাতে মানুষের জন্য কাজ করছেন। এমন দৃষ্টান্ত খুব কমই দেখা যায়।
ভ্যানচালক সেন্টু শেখ বলেন, শুরুর দিকে আমরা ওকে নিয়ে হাসতাম। ভাবতাম, এত পড়াশোনা করে এসব কাজ কেন করে। পরে বুঝেছি, সমাজে তপনের মতো মানুষের খুব প্রয়োজন। এখন তার কারণে আমরা নিরাপদে চলাচল করতে পারি।
বাটিকামারী গ্রামের বাসিন্দা ও মোটরসাইকেল চালক নাঈমুল ইসলাম বলেন, মুকসুদপুরের অসংখ্য রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে তপনের কাজের ছোঁয়া রয়েছে। নিজের অর্থে মানুষের জন্য এত কাজ করা সত্যিই বিরল। আমিও ফোন দিয়ে তপন বাবুকে বিভিন্ন জায়গার সমস্যার কথা বলেছি। তিনি সেখানে গিয়ে কাজগুলো করে দিয়েছেন।
এলাকার প্রবীণ লিয়াকত মৃধা বলেন, যে কাজ সরকারের করার কথা, সেই কাজ নিজের টাকায় করে দিচ্ছে তপন। সে সত্যিই মানবতার ফেরিওয়ালা। আল্লাহ তাকে সুস্থ ও দীর্ঘায়ু করুন।
মানবতার এক উজ্জ্বল প্রতীকঃ
স্বার্থপরতার এই যুগে তপন ঘোষ প্রমাণ করেছেন,মানুষের পাশে দাঁড়াতে বড় কোনো পদ, ক্ষমতা কিংবা বিপুল সম্পদের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন শুধু একটি মানবিক হৃদয় এবং আন্তরিক সদিচ্ছা। নিজের অর্থ, শ্রম ও সময় ব্যয় করে তিনি যেভাবে নীরবে মানুষের জন্য কাজ করে চলেছেন, তা শুধু মুকসুদপুর বা গোপালগঞ্জ নয়, দেশের তরুণ সমাজের জন্য এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে বলে মনে করেন ।
মায়ের চোখে সন্তানের পরিচয়ঃ
তপনের মা কল্যাণী ঘোষ আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আমার তিন ছেলের মধ্যে তপন সবচেয়ে ছোট। ছোটবেলা থেকেই সে অন্যের উপকার করতে ভালোবাসত। পাড়া- প্রতিবেশীর যেকোনো কাজে সবার আগে ছুটে যেত। চাকরি ছেড়ে এখন ব্যবসা করে, সে কিন্তু প্রতিদিন দুপুরের খাবার খেয়েই মানুষের সেবায় বেরিয়ে পড়ে। আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে তার কাজকে সম্মান করি। গ্রামের মানুষ যখন আমার ছেলের প্রশংসা করেন, তখন একজন মা হিসেবে আমার বুক গর্বে ভরে যায়।তিনি বলেন, তিন ছেলে , ছেলে বউ, নাতি নাতনি নিয়ে আমি একই সঙ্গে বসবাস করি।সংসারে কোন ঝগড়া বিবাদ নেই। ভালো আছি ঈশ^রের কৃপায়।
স্থানীয়দের বিশ্বাসঃ
এমন মানবিক উদ্যোগ যদি সমাজের আরও অনেক শিক্ষিত তরুণ গ্রহণ করেন, তবে দেশের অসংখ্য ছোট ছোট সমস্যা খুব সহজেই সমাধান করা সম্ভব। আর তাই আজ তপন ঘোষ শুধু একজন ব্যবসায়ীর নাম নয়; তিনি মানবতা, দায়বদ্ধতা এবং নিঃস্বার্থ জনসেবার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
Design & Developed By: JM IT SOLUTION