রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
দেশজুড়ে ৫ হাজার তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ বাংলাদেশ ব্যাংকের কোটালীপাড়ায় শিক্ষিকাকে উত্ত্যক্ত করায় বখাটে যুবককে মারধর করে আহত অস্তিত্ব সংকটে গোপালগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী বর্ণি বাওড় ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়ার ছয় সংবাদমাধ্যমের ১৭ সাংবাদিক পেলেন পুরস্কার মুকসুদপুরে ৫টি পাটের গোডাউনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, ১০ লাখ টাকার ক্ষতি ক্রীড়ার বহুমাত্রিক আয়োজনে মুখর বসুন্ধরা স্পোর্টস সিটি বসুন্ধরা গ্রুপের উদ্যোগে সেলাই মেশিনে বদলাবে ২০ নারীর জীবন ক্রেতাদের আগ্রহে এক ঘণ্টা বাড়ল আইসিসিবির কার বাজারের সময় গোপালগঞ্জে গ্যাস সিলিন্ডার ডিলারকে ২ লাখ টাকা জরিমানা মুকসুদপুরে বাসচাপায় বাইসাইকেল আরোহী নিহত

অস্তিত্ব সংকটে গোপালগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী বর্ণি বাওড়

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬, ২.৩৭ পিএম
  • ১৯ Time View
28

কালের খবর ডেক্সঃ

একসময় গোপালগঞ্জের যে বাওড়ের মাছের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল সুদূর কলকাতা পর্যন্ত, আজ ঐতিহ্যবাহী সেই বর্ণি বাওড় এখন অস্তিত্ব সংকটে। কচুরিপানার বিস্তার, পলি জমে পানির গভীরতা ও নাব্যতা কমে যাওয়া, নিষিদ্ধ জাল ও অবৈধ পদ্ধতিতে মাছ শিকার এবং জলজ প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে এ জলাভূমির মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একদিকে জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে নির্বিচারে মাছ শিকারের কারণে কমে যাচ্ছে দেশীয় মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র। ফলে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন বাওড়নির্ভর মৎস্যজীবীরা।

কর্তৃপক্ষ বলছে, বর্ণি বাওড়ের মাছের প্রজনন ও নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে অভয়াশ্রম তৈরির পাশাপাশি নিষিদ্ধ জাল ও অবৈধ মাছ শিকারের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, বাওড়ের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, কচুরিপানা ও আগাছা অপসারণ এবং অবৈধ দখল ও মাছ শিকার বন্ধে দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

হারিয়ে যাচ্ছে মাছের সেই সমৃদ্ধিঃ

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা গোপালগঞ্জ সদর ও টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী বর্ণি বাওড়। একসময় দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক মৎস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল এই জলাভূমি। বাওড়ের পানিতে পাওয়া যেত দেশীয় নানা প্রজাতির মাছ ও কচ্ছপ। জেলেদের নৌকা আর মাছ ধরার জালের ব্যস্ততায় মুখর থাকত পুরো এলাকা।

রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল, শোল, টেংরা, কৈ, পুঁটি, পাবদা, আইড়, চিতলসহ নানা দেশীয় মাছ ছিল বর্ণি বাওড়ের পরিচিতি। মাছ ছিল স্থানীয় মানুষের খাদ্যের অন্যতম প্রধান উৎস, একই সঙ্গে শত শত পরিবারের জীবিকা চলত এই জলাভূমিকে ঘিরে।

শুধু মাছ নয়, বর্ণি বাওড়কে ঘিরে গড়ে উঠেছিল স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। বাওড়ের বিস্তীর্ণ অংশ এখন কচুরিপানায় ঢাকা। কোথাও কোথাও পলি জমে কমে গেছে পানির গভীরতা। শীত মৌসুমে বাওড়ের অনেক অংশে জেগে ওঠে চর। ফলে মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজননের সুযোগও কমে যাচ্ছে।

আগের মতো আর মাছ পাওয়া যায় নাঃ

বাওড়পাড়ের বাসিন্দা সেলিম হোসেন জমাদ্দার বলেন, চায়না জাল ও বৈদ্যুতিক শটের মতো নিষিদ্ধ পদ্ধতি ব্যবহার করে নির্বিচারে মাছ শিকার করা হচ্ছে। এতে বড় মাছের পাশাপাশি ধ্বংস হচ্ছে মাছের ডিম, পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণী। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাওড়ের প্রাকৃতিক প্রজননব্যবস্থা। তিনি বলেন, একসময় বর্ণি বাওড়ে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এখন আগের তুলনায় মাছের উপস্থিতি অনেক কমে গেছে।

প্রায় ৬০ বছর বয়সী মৎস্যশিকারি সুনিল সরকার নিজের শৈশবের স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, ছোটবেলায় জাল পেতে কিংবা কাঠা ঘিরে বড় বড় রুই, কাতলা, মৃগেল, শোল, বোয়াল, পাবদা, সরপুঁটি, আইড় ও চিতল মাছ ধরেছেন তিনি। তখন বাওড় ছিল অনেক গভীর। বড় চৈড় (নৌকার বৈঠা) না হলে নৌকা চালানোও কঠিন ছিল।

তিনি বলেন, এখন পুরো বর্ষা মৌসুমেও কোথাও কোথাও বাওড়ের পানির গভীরতা ৮ থেকে ১০ হাতের বেশি হয় না। আবার কোনো কোনো স্থানে গভীরতা নেমেছে ৪-৫ হাতের মধ্যে। শীতকালে বাওড়ের অনেক জায়গা জেগে ওঠে।

সুনিল সরকারের ভাষ্যমতে, বাওড়ে প্রচুর পলি মাটি জমে গেছে। ফলে মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। এর পাশাপাশি কৃষিজমিতে কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে পানির স্বাভাবিক পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তার ওপর চলছে অবৈধ উপায়ে মাছ শিকার। ‘সব মিলিয়ে বাওড়ের অবস্থা খুবই খারাপ। এভাবে চলতে থাকলে একসময় এখানে কোনো মাছই পাওয়া যাবে না’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

কচুরিপানা-আগাছায় সংকুচিত মাছের আবাসঃ

স্থানীয় বাসিন্দা জাদির হোসেনের অভিযোগ, বর্ণি বাওড়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কাঠা দিয়ে মাছ শিকার করেন। এতে সাধারণ স্থানীয় মৎস্যজীবীরা ঠিকমতো মাছ ধরার সুযোগ পান না। তাঁর মতে, বাওড়ের বিভিন্ন অংশে প্রচুর শেওলা ও আগাছা জন্মেছে। বছরের বড় একটা সময় কচুরিপানায় ঢেকে থাকে বাওড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা। এর সঙ্গে পাট পচানো, ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং অন্যান্য দূষণের কারণে জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে।

জাদির হোসেন আরও বলেন, এসব সমস্যা বন্ধ করা গেলে এবং বাওড়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা গেলে আবারও দেশীয় মাছের আধার হিসেবে বর্ণি বাওড় তার পুরোনো ঐতিহ্য ফিরে পেতে পারে।

প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাঃ

বর্ণি বাওড়ের বর্তমান পরিস্থিতি শুধু মাছ কমে যাওয়ার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি বৃহৎ জলাভূমির পরিবেশগত ভারসাম্য। মাছের প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হলে এর প্রভাব পড়ে অন্যান্য জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদের ওপরও। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাওড়নির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বর্ণি বাওড়ের জীববৈচিত্র্য ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় এমন কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, সরকারি ভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মাছের প্রজনন ও নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত করতে অভয়াশ্রম তৈরির পাশাপাশি নিষিদ্ধ জাল ও অবৈধ মাছ শিকারের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। তবে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের জীবিকা নিশ্চিত করতে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও জানান তিনি।

ঐতিহ্য ফেরানোর দাবিঃ

বর্ণি বাওড় শুধু একটি জলাভূমির নাম নয়, এটি স্থানীয় মানুষের জীবিকা, খাদ্য, সংস্কৃতি ও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ। তাই এই বাওড় রক্ষা করা গেলে শুধু মাছের প্রাচুর্যই ফিরবে না, টিকে থাকবে একটি গুরুত্বপূর্ণ জলজ প্রতিবেশ এবং এর ওপর নির্ভরশীল শত শত মানুষের জীবন-জীবিকাও—বলে মনে করেন স্থানীয়রা।#

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Advertise

Ads

Address

Office : Sheikh Fazlul Haque Moni Stadium (2nd floor), Gopalganj-8100 Mobile: 01712235167, Email: kalerkhabor24.com@gmail.com
© All rights reserved 2022

Design & Developed By: JM IT SOLUTION