রেজোয়ান চৌধুরীঃ
বিল বাওড় ও জলাভূমি বেষ্টিত জেলা গোপালগঞ্জ। এই জেলার বিভিন্ন নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ে বেশ কয়েক বছর চায়না দুয়ারী জালসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ ও অবৈধ জালের ব্যবহার আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।পরিবেশবিদ ও স্থানীয়দের মতে,এসব জালের নির্বিচার ব্যবহারের ফলে দেশীয় প্রজাতির মাছের পাশাপাশি নানা ধরনের জলজ প্রাণীও হুমকির মুখে পড়ছে।মৎস্য বিভাগ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করেও এই অবৈধ মাছ শিকার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তারা এ সমস্যা মোকাবিলায় প্রশাসনিক তৎপরতার পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
সরেজমিনে গোপালগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এবং জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গোপালগঞ্জের পাঁচ উপজেলায় ছোট-বড় শতাধিক বিল, বাওড় ও জলাশয় রয়েছে। একসময় এসব জলাশয় দেশীয় প্রজাতির প্রাকৃতিক মাছে সমৃদ্ধ ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নের জন্য বিলের মধ্য দিয়ে সড়ক নির্মাণ, পানি প্রবাহে বাধা এবং বর্ষা মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চায়না দুয়ারী জাল, ভেসাল জাল, বৈদ্যুতিক শক এবং বিষটোপ ব্যবহার করে মাছ শিকারের মতো অবৈধ পদ্ধতি। সহজে অধিক মাছ আহরণের উদ্দেশ্যে কিছু অসাধু শিকারি এসব পদ্ধতি ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে চায়না জালের ফাঁস (ফাকা)অত্যন্ত ছোট হওয়ায় ছোট-বড় সব ধরনের মাছ, মাছের পোনা এবং অন্যান্য জলজ প্রাণী এতে আটকা পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে মাছ শিকারের ফলে দেশীয় মাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ফলে স্থানীয় বাজারেও আগের মতো দেশীয় মাছ পাওয়া যাচ্ছে না এবং মানুষ বাধ্য হয়ে চাষের মাছের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন মৎস্য শিকারী বলেন,বর্ষা মৌসুমে আমাদের এলাকায় কোন কাজ থাকে না।আয় রোজগার নাই। তাই বাধ্য হয়ে চায়না দুয়ারী জাল পেতে বিল থেকে মাছ শিকার করি। ছোটবড় সব ধরনের মাছ এই জালে ধরাপড়ে। এর সাথে জলে বসবাস করা জলজপ্রাণীও আটকা পরে। এই জালে নিজেদের খাওয়ার মাছ হয়ে যায়। যেদিন বেশি হয় সেখান থেকে বিক্রি করে সংসার চালাই।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার করপাড়া গ্রামের বাসিন্দা লিয়াকত আলী মোল্লা বলেন, চায়না জালে মাছের পাশাপাশি সাপ, ব্যাঙ, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীও ধরা পড়ে। ছোট মাছ বড় হওয়ার আগেই ধরা পড়ে যাওয়ায় বংশবৃদ্ধি হয়না।ফলে দেশীয় মাছ দিন দিন কমে যাচ্ছে।
একই উপজেলার বাসিন্দা মনিন্দ্রনাথ বিশ্বাস বলেন, আগে নদী থেকে খাল-বিলে প্রচুর মাছ আসত। এখন পানি ও স্রোত কমে গেছে। এর ওপর চায়না জাল, দুয়ারী জাল ও অন্যান্য অবৈধ পদ্ধতিতে মাছ ধরার কারণে মাছ ডিম ছাড়ার সুযোগ পায় না। ফলে আগের মতো দেশীয় মাছ আর পাওয়া যায় না।
ডোমরাসুর গ্রামের পাগলা মালাকার, সুবোধ বিশ্বাস, জঞ্চয় ঢালী,কাশিয়ানী উপজেলার সিংগা গ্রামের বৈদ্যনাথ বিশ্বাস, স্বপন বিশ্বাস হাতিয়ারা গ্রামের সোলায়মান কাজী এবং অনুপম মন্ডলসহ একাধিক মানুষের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, বর্ষা মৌসুমে পানি আসার শুরু থেকেই বিলে অবৈধ জাল পেতে মাছ ধরা হয়। এতে ডিমওয়ালা মাছ এবং মাছের পোনা নির্বিচারে ধরা পড়ে।একদিকে পানি স্বল্পতার অপরদিকে অবৈধ জালের ব্যবহার দেশীয় মাছের সংকট আরও বাড়িয়ে তুলছে।

গোপালগঞ্জ শহরের পাচুড়িয়া এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ আকবর হোসেন বলেন, চায়না জাল ও কারেন্ট জালের কারণে দেশী মাছের রেণু-পোনা পর্যন্ত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।আগে বাজারে দেশী মাছে সয়লাভ ছিল। এখন আর সেই মাছ চোখে পড়েনা। যা পাওয়া যায় তাতো অধিক দামের কারনে কাছেই যাওয়া যায়না। প্রশাসনের কঠোর নজরদারি বাড়ানো গেলে দেশীয় মাছের সংখ্যা আবারও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আমার মনে হয়।
শিক্ষকপল্লীর বাসিন্দা মানস মন্ডল বলেন, বাজারে দেশীয় মাছের সংকট রয়েছে। অন্য মাছের দামও অনেক বেশি। এতে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছে।মুকসুদপুর উপজেলার ধর্মরায়েরবাড়ি গা্রমের ব্যবসায়ী বরুণ মজুমদার বলেন, চায়না জালের ব্যবহার বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া খুবই প্রয়োজন। তা না হলে দেশীয় মাছ আরও কমে যাবে।
এ বিষয়ে গোপালগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ কামরুল ইসলাম জানান, অবৈধ উপায়ে মাছ শিকার রোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না।দেশীয় মাছ ও জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর জাল ও অন্যান্য অবৈধ উপকরণের ব্যবহার বন্ধে সবাইকে এগিয়ে আসার আাহবান জানান তিনি।
Design & Developed By: JM IT SOLUTION