বিশেষ প্রতিবেদনঃ
ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। বিলের পানিতে কুয়াশার আবেশ। চারপাশের নীরবতা ভেঙে কেবল শোনা যাচ্ছে পানিতে নৌকার লগি বা বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নৌকায় চড়ে বিলপাড়ের শত শত দরিদ্র মানুষ সংগ্রহ করছেন জলজপ্রাণী শামুক। এসব মানুষদের বর্ষা মৌসুমে পরিবারের খাবার, সন্তানের পড়াশোনা আর সংসারের খরচ জোগানোর একটি ভরসা হয়ে হাজির হয় শামুক সংগ্রহ।
গোপালগঞ্জের বিভিন্ন বিল ও জলাশয়ে বর্ষা এলেই এমন দৃশ্য দেখা যায়। সদর উপজেলার সাতপাড়, বলাকোড়, বড়খোলা, কাশিয়ানীর সিংগা, বরইভিটা, রাহুথড়, বরমপাল্টা, পাথরগ্রাম, মুকসুদপুর উপজেলার চান্দার বিল ও টুঙ্গিপাড়া উপজেলার বর্ণিবিল,বাঘিয়ারকুল, জোয়ারিয়ার বিলসহ জেলার বিভিন্ন জলাভূমি থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শামুক সংগ্রহ করা হচ্ছে।পরে সেগুলো জমা হচ্ছে স্থানীয় সিংগা গ্রামের মল বাজার,বরমপাল্টা এবং কোটালীপাড়ার রামনগর বাজারে। প্রতিদিন এসব বাজারে শামুক বেচাকেনা হয়ে থাকে। এছাড়া ফড়িয়া ব্যবসায়ীরা গ্রাম ঘুরে রাস্তার পাশে অপেক্ষামান বস্তাভর্তি শামুক কিনে নিচ্ছেন প্রতিদিন। সেখান থেকে তা যাচ্ছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার চিংড়ি বা মৎস্য ঘেরে।
স্থানীয়দের দাবি, জেলার বিভিন্ন বিল ও আশপাশের জলাশয় থেকে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ বস্তা শামুক সংগ্রহ ও কেনাবেচা হয়ে থাকে। এই বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন সংগ্রহকারী, ফড়িয়া ও পাইকার ব্যবসায়ীরা।ফলে এর ওপর গড়ে উঠেছে একটি বড় স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
কিন্তু এই বাণিজ্যের আড়ালে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে বিলের চেহারা। একসময় যে পানিতে চোখে পড়ত অসংখ্য শামুক,সেখানে এখন আগের তুলনায় কমছে শামুকের উপস্থিতি। এমনটাই বলছেন স্থানীয় সংগ্রহকারী ও ব্যবসায়ীরা।
সিংগা গ্রামের শামুক সংগ্রহকারী সমীর বিশ্বাসের দিন শুরু হয় খুব ভোরে। বর্ষা মৌসুমে বিল থেকে শামুক সংগ্রহ করেই চলে তাঁর সংসার।তিনি বলেন, বর্ষা মৌসুমে বিল বা জলাশয় থেকে শামুক তুলি। সেই শামুক বিক্রি করে ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ চালাই।আষাঢ় মাস থেকে শামুক তোলা শুরু হয়, চলে আশ্বিন মাস পর্যন্ত।বিলে শামুক কম থাকায় প্রতিদিন একজন সংগ্রহকারী চার-পাঁচ বালতি (মাঝারি সাইজ)শামুক সংগ্রহ করতে পারে। প্রতি বালেতি শুমুক ৮০টাকা দরে বিক্রি হয়।
একই গ্রামের আরেক সংগ্রহকারী প্রশান্ত ঢালীর কাছেও শামুক মৌসুমি আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তিনি বলেন, আমরা সিংগা ও চান্দার বিল থেকে শামুক তুলি।বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা এসে এসব শামুক কিনে নিয়ে যায়। ৫৫কেজির প্রতি বস্তা শামুক সাড়ে ৪৮০টাকায় বিক্রি করি। এতে আমরা আর্থিকভাবে বেশ উপকৃত হই।
সিংগা উত্তরপাড়ার মল্লিক বাড়ির অনাধি মৌলিকের জীবনেও বর্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে শামুক সংগ্রহ। ভোর সাড়ে ৪টার দিকে শুরু হয় তাঁর কাজ। সকাল ৯টা পর্যন্ত বিলের পানিতে শামুক ও শাপলা সংগ্রহ করেন তিনি।অনাধি মৌলিক বলেন, এই কাজ করেই বর্ষা মৌসুমের আয়-রোজগার হয়। দক্ষিণের জেলা সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও পিরোজপুর থেকে পাইকাররা এসে শামুক কিনে নিয়ে যায়। গত বছর বিলে শামুক খুবই কম ছিল, আয়ও কম হয়েছে। এবার তুলনামূলক একটু বেশি পাওয়া যাচ্ছে।

স্থানীয় পাইকার ব্যবসায়ী অরুণ গোলদার বলেন, বিল এলাকার মানুষদের কাছ থেকে শামুক কিনে বাগেরহাটের চিংড়ি ঘের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করি। খরচ বাদে বস্তা প্রতি ৮০/৯০টাকা লাভ হয়।যা হয় তা দিয়ে ভালোই আছি।
অপর পাইকার ব্যবসায়ী সমর মজুমদার,অশোক সরকার ও পরেশ বিশ্বাস বলেন, আমরা বিলপাড়ের শ্রমিকদের কাছ থেকে ঘুরে ঘুরে শামুক কিনি। তবে আগের মতো শামুক পাওয়া যায় না। অথচ চিংড়ি ঘের মালিকদের কাছে এর চাহিদা রয়েছে বেশ।
তাঁদের ভাষ্যমতে, চিংড়ি ঘেরে শামুক খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অনেক চাষি মাছের অন্যান্য খাবারের পাশাপাশি শামুকও ব্যবহার করেন।ফলে বিলের একটি প্রাকৃতিক সম্পদ ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক পণ্যে।তবে ইরিবোরো চাষাবাদে অতিরিক্ত মাত্রায় কিটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহারের ফলে শামুক প্রজননে ব্যাঘাত ঘটছে।
জলাশয়ে ফিরেছে শামুক, সংরক্ষণের দাবিঃ
মুকসুদপুর উপজেলার উজানী ইউনিয়নের ধর্রায়েরবাড়ী গ্রামের কৃষক হরষিৎ মজুমদার বলেন, একসময় চান্দারবিলসহ আশপাশের ইউনিয়নগুলোর বিল ও জলাশয়ে প্রচুর শামুক পাওয়া যেত। তখন বিলপাড়ের দরিদ্র মানুষ বিল ও জলাশয় থেকে শামুক কুড়িয়ে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। প্রতিদিন পাঁচ-ছয়টি ট্রলার বিলে এসে এসব শামুক কিনে নিয়ে যেত। নির্বিচারে শামুক আহরণ ও বিক্রির ফলে একপর্যায়ে বিলগুলো থেকে শামুক প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়।
তিনি বলেন, গত চার-পাঁচ বছর ধরে বিলে তেমন শামুক পাওয়া যেত না। গত বছরও শামুকের অস্তিত্ব চোখে পড়েনি। ফলে কেউ আর বিলে শামুক কুড়াতে যেতেন না। তবে চলতি বর্ষা মৌসুমের আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত বিলে আবারও বেশ কিছু শামুকের দেখা মিলেছে। এতে দরিদ্র মানুষ শামুক কুড়িয়ে বিক্রি করে এ বছর কিছুটা আয় করতে পেরেছেন।
হরষিৎ মজুমদার আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, শামুক আহরণ বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আগের মতোই বিল ও জলাশয় থেকে এই প্রাকৃতিক সম্পদ হারিয়ে যেতে পারে।
উজানী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দিনেশ মন্ডল ও সিংগা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রথিন্দ্রনাথ বিশ্বাসের সঙ্গে কথা হলে তাঁরা বলেন, একসময় বিলে ও জলাশয়ে অবাধে শামুক পাওয়া যেত। তখন এসব এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির পাখিরও প্রচুর আনাগোনা ছিল। শামুকের ডিম পাখির অন্যতম প্রিয় খাবার হওয়ায় জলাভূমিগুলো ছিল পাখিদের বিচরণক্ষেত্র। সে সময় এলাকায় বোরো ধানের আবাদ ছিল না; মূলত আউশ ও আমন ধানের চাষ হতো। এসব ধান চাষে কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহারও ছিল না বললেই চলে।
তাঁরা আরও বলেন, একসময় বিলে নৌকা চালানোর সময় পানির নিচে থাকা শামুকের কারণে একধরনের গড়গড় শব্দ শোনা যেত। কিন্তু এখন আর সেই দৃশ্য ও শব্দের দেখা মেলে না। দীর্ঘদিন পর বিলে নতুন করে শামুকের উপস্থিতি দেখা দেওয়ায় একে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে আবারও জলাশয় থেকে শামুক হারিয়ে যেতে পারে।
তাঁদের মতে, শামুক শুধু জলজ পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানই নয়, এটি জলাভূমির জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষায়ও ভূমিকা রাখে। তাই নির্বিচারে শামুক আহরণ বন্ধ, প্রজনন মৌসুমে আহরণ নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান ড. মোঃ রাশেদুজ্জামান বলেন, “নির্মল পানি পেতে শামুকের ভূমিকা রয়েছে। বিল বা জলাশয়ের আবর্জনা ও বিভিন্ন দূষিত বস্তু খেয়ে শামুক জীবন ধারণ করে এবং পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। জলাভূমি রক্ষায় শামুকের গুরুত্ব অনেক।
তাঁর মতে জলাভূমির বাস্তুতন্ত্রে ছোট প্রাণী বলে কোনো প্রাণীই অগুরুত্বপূর্ণ নয়। শামুকও তার ব্যতিক্রম নয়। জলজ পরিবেশের জৈবিক প্রক্রিয়ায় শামুকের ভূমিকা রয়েছে বেশ। জলাশয়ের বিভিন্ন জৈব পদার্থ ও আবর্জনা খাওয়ার মাধ্যমে তারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে।
তিনি বলেন,অতিরিক্ত শামুক আহরণের ফলে জলজ পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই শামুক সংগ্রহকারীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আহরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন। অন্যদিকে, নির্বিচারে আহরণ চলতে থাকলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ। শামুক কমে গেলে তার ওপর নির্ভরশীল জলজ প্রাণীর খাদ্যচক্রেও প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বিলের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। কোন মৌসুমে কতটা শামুক সংগ্রহ করা যাবে, কোন এলাকায় প্রজনন মৌসুমে আহরণ বন্ধ রাখা প্রয়োজন এবং কোন জলাভূমিকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা যায়, এসব বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ, পরিবেশ অধিদপ্তর, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিলের শামুক হারিয়ে গেলে শুধু একটি প্রাণী কমবে না; তার সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে একটি জলাভূমির স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খলও। গোপালগঞ্জের বিলগুলো তাই এখন এক ধরনের নীরব সংকেত দিচ্ছে। যে শামুক একদিকে দরিদ্র মানুষের মৌসুমি আয়ের ভরসা, অন্যদিকে সেই শামুকই জলাভূমির সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মানুষ ও প্রকৃতির এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন এমন একটি ব্যবস্থাপনা, যেখানে জীবিকার চাকা চলবে, আবার বিলের বুকেও টিকে থাকবে শামুকের স্বাভাবিক জীবন।
এ ব্যাপারে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ কামরুল ইসলাম বলেন, আমরা জলজ প্রাণী ও মৎস্য সংরক্ষণে সর্বদা সচেষ্ট থাকি। গোপালগঞ্জের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় কাজ করছি। লোকবল সংকট থাকা সত্যেও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জলজ প্রাণী ও মৎস্য রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্বের সঙ্গে কাজ করছেন।তিনি জানান, শামুক সংগ্রহকারী ও বিক্রেতাদের সঙ্গে সভা করে অতিরিক্ত শামুক আহরণ থেকে বিরত থাকার বিষয়ে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। আশাকরি উদ্যোগটি ফলপ্রসু হবে।
Design & Developed By: JM IT SOLUTION