মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
টুঙ্গিপাড়ায় দুই গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া; ইট-পাটকেলের আঘাতে আহত ১০ ইউনূস আমলেও পদায়ন নিয়ে ঘুষের অভিযোগ, বদলিতে লটারি নতুন পথ বসুন্ধরায় ফিলিং স্টেশন সংকটে বাড়ছে কুড়িল-খিলক্ষেতের যানচাপ আকাশসীমায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, ছয় মাসে ৪১৬ কোটি টাকা রাজস্ব শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে গোপালগঞ্জে বিশ্ব বসতি দিবস পালিত টুঙ্গিপাড়ায় এনসিপির কমিটি গঠনের ৮ দিন পর আহবায়কের পদত্যাগ কাশিয়ানীতে বাসচাপায় স্বামী-স্ত্রী নিহত গোপালগঞ্জে দোকান কর্মচারী হত্যার অভিযোগ, গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন টেকসই আবাসন গড়তে সবুজ ভবনের দিকে ঢাকার যাত্রা ২২ বছরে আস্থার প্রতীক বসুন্ধরা সিটি, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে বর্ণিল আয়োজন

ইউনূস আমলেও পদায়ন নিয়ে ঘুষের অভিযোগ, বদলিতে লটারি নতুন পথ

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৬, ৫.২৮ পিএম
  • ৮ Time View
10

বিশেষ প্রতিনিধিঃ

সরকারি কর্মকর্তাদের বদলি ও পদায়নকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে প্রথমবারের মতো লটারি পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া এই পদক্ষেপ সফল হলে সরকারি প্রশাসনে বদলি বাণিজ্য বন্ধের ক্ষেত্রে এটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

সম্প্রতি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাবরেজিস্ট্রারদের বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে লটারির মাধ্যমে পদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে নির্ধারিত সময়ে এ লটারি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ঢাকা জেলার সাবরেজিস্ট্রি অফিসগুলোর জন্য নির্ধারিত পদগুলোতে দেশের বিভিন্ন জেলার সাবরেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত সাবরেজিস্ট্রারদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে বদলি করা হবে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের উপস্থিতিতে এ কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে বদলি ও পদায়নকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষ করে ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। সাবরেজিস্ট্রারের পদও এর বাইরে নয়। অভিযোগ রয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ ও আর্থিকভাবে লাভজনক কিছু এলাকায় পদায়ন পেতে অনৈতিক লেনদেনের আশ্রয় নেওয়া হয়। ফলে একজন কর্মকর্তা যদি কোনো পদে যেতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর সেই অর্থ তুলে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর।

বদলি বাণিজ্যের এই সংস্কৃতি কেবল সাবরেজিস্ট্রি অফিসেই সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে পছন্দের কর্মস্থল, গুরুত্বপূর্ণ পদ কিংবা আর্থিকভাবে সুবিধাজনক এলাকায় পদায়নকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো পদ ও কর্মস্থলকে ঘিরে অতীতে বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগও গণমাধ্যমে এসেছে। একজন কর্মকর্তা যদি অর্থ ব্যয় করে একটি পদে দায়িত্ব নেন, তাহলে সেই বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার মানসিকতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আর সেখান থেকেই দুর্নীতির চক্র আরও শক্তিশালী হতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের পদায়ন নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ ও অভিজাত এলাকার থানাগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাওয়া নিয়ে অতীতে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। শুধু ঊর্ধ্বতন পদ নয়, অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের পদায়ন নিয়েও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ শোনা যায়। এসব অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন ওঠে—একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি দায়িত্ব পাওয়ার জন্য ঘুষ দেন, তাহলে দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি কতটা সততা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে পারবেন?

নিম্ন আদালতের বিচারকদের বদলি ও পদায়ন নিয়েও বিভিন্ন সময়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিচার বিভাগের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যদি বদলি ও পদায়ন নিয়ে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ থাকে, তাহলে তা পুরো বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও পদায়ন ও পদোন্নতিকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সচিব পর্যায়ে পদায়ন ও পদোন্নতির জন্য ঘুষ লেনদেনের ঘটনা ঘটেছে প্রকাশ্যে—এমন অভিযোগও সে সময় সামনে আসে। একই সময়ে জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদায়নকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য সে সময় গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছিল। ফলে সরকার পরিবর্তন হলেও বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতিকে ঘিরে অনিয়মের সংস্কৃতি যে সহজে দূর হয়নি, এসব ঘটনা তারই ইঙ্গিত দেয়।

বন বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও নির্দিষ্ট জেলা বা কর্মস্থলের পদকে বেশি আকর্ষণীয় মনে করা হয় এবং এসব পদে যেতে কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিযোগিতার সুযোগ নিয়েই একটি অনৈতিক লেনদেনের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। উচ্চপর্যায়ের কোনো কোনো পদ নিয়েও অতীতে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে।

ডাক্তারদের পদায়নেও বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। একজন চিকিৎসককে ঢাকায় বদলি হতে লাখ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অনেক চিকিৎসকই ঢাকার বাইরে কর্মরত থাকতে অনাগ্রহী। এর অন্যতম কারণ দেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার অতিরিক্ত ঢাকামুখী হয়ে পড়া। ফলে রাজধানীতে থাকার আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় এবং কাঙ্ক্ষিত কর্মস্থলে বদলি হতে নানা ধরনের তদবির ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে।

ইউনূস আমলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে চিকিৎসক ও কর্মচারীদের ব্যাপক বদলি নিয়েও আলোচনা হয়। তিন হাজার মেডিক্যাল অফিসার ও ৫০০ কর্মচারীর চেয়ার রদবদল করা হয়েছিল বলে জানা যায়। এত স্বল্প সময়ে অতীতে অধিদপ্তরে এমন ব্যাপক বদলি হয়নি—এমন কথাও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচিত হয়েছে। বদলি হওয়া অনেক চিকিৎসক জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে প্রত্যন্ত ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় জনবল সংকট আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

সরকারি চাকরি যাঁরা করেন, তাঁদের একটি বড় অংশ রাজধানীতে কর্মরত থাকতে চান—এটি বাস্তবতা। কিন্তু ১৮ কোটি মানুষের দেশে সবাই যদি ঢাকায় চাকরি করতে চান, তাহলে ঢাকার বাইরের বিপুল জনগোষ্ঠী সরকারি সেবা পাবে কীভাবে? চিকিৎসা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, ভূমি, প্রকৌশলসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই ঢাকাকেন্দ্রিকতার প্রভাব দেখা যায়। আর এর পেছনে বদলি ও পদায়নের বর্তমান ব্যবস্থারও একটি বড় ভূমিকা রয়েছে।

এই বাস্তবতায় সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্তকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সংস্কার হিসেবে দেখা যেতে পারে। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—কোন কর্মকর্তা কোন কর্মস্থলে যাবেন, তা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রভাব, তদবির কিংবা আর্থিক লেনদেনের সুযোগ কমে আসবে। যোগ্য কর্মকর্তাদের নির্ধারিত তালিকা থেকে লটারির মাধ্যমে পদায়ন করা হলে বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অনিয়মের সুযোগ কমবে।

তবে শুধু লটারি চালু করলেই দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ হবে—এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। লটারির পাশাপাশি কর্মকর্তাদের যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, শৃঙ্খলা, কর্মস্থলের প্রয়োজন এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে দায়িত্ব পালনের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে লটারির পুরো প্রক্রিয়াটি প্রকাশ্য, প্রযুক্তিনির্ভর ও নিরীক্ষাযোগ্য হওয়া জরুরি। তাহলে এই উদ্যোগের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে।

সাবরেজিস্ট্রারদের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি সফল হলে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদেও এর প্রয়োগ নিয়ে ভাবা যেতে পারে। যেমন জেলা প্রশাসক নিয়োগের ক্ষেত্রে নির্ধারিত যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণকারী কর্মকর্তাদের একটি স্বচ্ছ ফিট লিস্ট তৈরি করে সেখান থেকে নীতিমালার ভিত্তিতে লটারির মাধ্যমে কর্মস্থল নির্ধারণ করা যেতে পারে। একইভাবে থানার ওসি কিংবা চিকিৎসকদের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন অনুযায়ী স্বচ্ছ ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব।

একজন কর্মকর্তা যদি ঘুষ বা তদবির ছাড়াই কোনো পদে দায়িত্ব পান, তাহলে সেই পদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাঁর ওপর একটি নৈতিক দায় তৈরি হয়। তখন পদটি পাওয়ার বিনিময়ে অর্থ ফেরত তোলার মানসিকতা থাকার কথা নয়। বরং কর্মদক্ষতা, সততা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমে নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করবেন—এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা।

তাই সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি চালুর উদ্যোগকে শুধু একটি বদলি প্রক্রিয়ার পরিবর্তন হিসেবে দেখলে হবে না। এটি সরকারি প্রশাসনে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা এবং বদলি-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে একটি নতুন ধারণার সূচনা করতে পারে। সরকার চাইলে এই অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে একই ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিতে পারে।

দুর্নীতি কমাতে শুধু আইন করে বা শাস্তির ভয় দেখিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন। দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে এমন কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোও দূর করতে হবে। বদলি ও পদায়ন যদি সেই দুর্বলতার অন্যতম জায়গা হয়, তাহলে সেখানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।

সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতির এই উদ্যোগ তাই একটি সম্ভাবনাময় সূচনা। এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত ও নিয়মিতভাবে মূল্যায়ন করা গেলে সরকারি চাকরিতে বদলি-বাণিজ্য কমানোর পাশাপাশি প্রশাসনে জবাবদিহি, নিরপেক্ষতা ও জনসেবার মান বাড়াতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Advertise

Ads

Address

Office : Sheikh Fazlul Haque Moni Stadium (2nd floor), Gopalganj-8100 Mobile: 01712235167, Email: kalerkhabor24.com@gmail.com
© All rights reserved 2022

Design & Developed By: JM IT SOLUTION