মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৩২ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
জাতিসংঘে তারেকের প্রথম ভাষণ ঘিরে জিয়া পরিবারের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা মুকসুদপুরে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে ট্রাকের ধাক্কা, নিহত ১ নকশা অনুমোদনে ওয়ানস্টপ সার্ভিস, প্রকল্পে অনিয়মে ব্যবস্থা কোটালীপাড়ায় বিএনপির বিক্ষোভ সমাবেশ গোপালগঞ্জে গাঁজাসহ দুই চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার কাশিয়ানীতে অগ্নিকাণ্ডে তিন ঘর পুড়ে ছাই, ৫ ছাগলের মৃত্যু কাশিয়ানী রেলস্টেশন থেকে যুবকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার অচিরেই বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হবে- এস এম জিলানী টেস্ট টিউবওয়েল সফল হওয়ার আগেই পাইপলাইন স্থাপন, গোপালগঞ্জে পানি সরবরাহ প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন সহযোগিতা বাড়িয়ে নির্ভরতা কমানো, দেশের সামনে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ

জাতিসংঘে তারেকের প্রথম ভাষণ ঘিরে জিয়া পরিবারের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২.৫২ পিএম
  • ৯ Time View
11

বিশেষ প্রতিনিধিঃ

নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সেই মঞ্চে বাংলাদেশের ইতিহাসের তিনটি ভিন্ন সময় যেন এক বিন্দুতে এসে মিলিত হতে যাচ্ছে। চার দশকের বেশি সময় আগে যে মঞ্চে দাঁড়িয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিশ্বব্যবস্থার বৈষম্য, দারিদ্র্য ও উন্নয়নবঞ্চিত মানুষের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, পরে একই আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এবার সেই ধারাবাহিকতায় প্রথমবারের মতো জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের হয়ে বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তাঁর এই ভাষণ জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আনুষ্ঠানিক উপস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে যাচ্ছে।

এই ঘটনাকে শুধু একটি রাষ্ট্রীয় সফর বা নিয়মিত কূটনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক মাত্রাটি পুরোপুরি ধরা পড়বে না। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তা, বৈশ্বিক ন্যায়বিচার নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন এবং একটি রাজনৈতিক পরিবারের তিন প্রজন্মের আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থিতির ধারাবাহিকতা।

গল্পটির প্রথম অধ্যায় শুরু হয়েছিল ১৯৮০ সালে।

সে বছরের ২৬ আগস্ট নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তখন বিশ্ব অর্থনীতি ছিল গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। তেলের মূল্যবৃদ্ধি, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণ ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যে বৈষম্য আন্তর্জাতিক আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। সেই প্রেক্ষাপটে জিয়াউর রহমান প্রশ্ন তুলেছিলেন—বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন ও সহযোগিতার এত প্রতিশ্রুতির পরও কেন পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ দারিদ্র্য ও ক্ষুধার মধ্যে পড়ে থাকবে?

তাঁর সেই প্রশ্ন কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা থেকে উঠে আসেনি। এর পেছনে ছিল সে সময়কার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন-ভাবনার বড় বিতর্ক।

একদিকে ছিল আধুনিকায়ন তত্ত্ব। ডব্লিউ. ডব্লিউ. রস্টোর ‘স্টেজেস অব ইকোনমিক গ্রোথ’ বা প্রবৃদ্ধির পর্যায় তত্ত্বের মতো ধারণায় মনে করা হতো, উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি উন্নত বিশ্বের অনুসৃত অর্থনৈতিক কাঠামোর পথে এগোয় এবং প্রয়োজনীয় পুঁজি, প্রযুক্তি ও বৈদেশিক সহায়তা পায়, তাহলে তারা ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক ‘টেক-অফ’-এর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবে।

অন্যদিকে নির্ভরশীলতা তত্ত্ব বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরে কেন্দ্র ও প্রান্তের অসম সম্পর্ককে সামনে নিয়ে আসে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কাঠামোগত বৈষম্যের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে নিজেদের অবস্থান বদলানো কঠিন হয়ে পড়ে।

এই বিতর্কের আন্তর্জাতিক প্রতিফলন ছিল ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে ঘোষিত নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বা এনআইইও। পরবর্তী সময়ে উত্তর-দক্ষিণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। ১৯৮০ সালের জাতিসংঘের ১১তম বিশেষ অধিবেশনেও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও নতুন অর্থনৈতিক কাঠামোর প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশ তখন ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত, দারিদ্র্যপীড়িত ও খাদ্যসংকটে থাকা একটি নবীন রাষ্ট্র। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের অভিঘাত তখনো গভীর। প্রায় সাড়ে নয় কোটি মানুষের দেশটির সামনে খাদ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।

এই বাস্তবতায় জিয়াউর রহমানের বক্তব্যে উঠে আসে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ন্যায্য অংশীদারির প্রশ্ন। তিনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উন্নয়ন সহায়তা, ঋণ, জ্বালানি ও বাজারসুবিধার ক্ষেত্রে অধিকতর ন্যায্য ব্যবস্থা চেয়েছিলেন। দরিদ্র দেশগুলোর ওপর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের চাপ কমাতে উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে—এমন ধারণাও তিনি সামনে আনেন।

এখানে তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আত্মনির্ভরতার ধারণা। তাঁর কাছে আত্মনির্ভরতা মানে বিশ্বের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়; বরং নিজেদের উৎপাদন ও সক্ষমতা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় সমান মর্যাদায় অংশ নেওয়া।

অর্থাৎ একদিকে তিনি বৈশ্বিক সহযোগিতা ও ন্যায্য বাণিজ্যের দাবি তুলেছেন, অন্যদিকে দেশের কৃষি, খাদ্য উৎপাদন ও নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এই দুইয়ের সমন্বয় তাঁর আন্তর্জাতিক বক্তব্যকে একটি স্বতন্ত্র মাত্রা দিয়েছিল।

জিয়াউর রহমানের সেই বক্তব্যের প্রায় ১৩ বছর পর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর ৪৮তম সাধারণ অধিবেশনে তাঁর ভাষণের মধ্য দিয়ে জিয়া পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হয়।

এরপর ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর স্মারক অধিবেশন, ২০০২ সালে শিশু বিষয়ক বিশেষ অধিবেশন এবং ২০০৫ সালে ৬০তম সাধারণ অধিবেশনের বিভিন্ন আয়োজনে তিনি বক্তব্য দেন। অর্থাৎ ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জাতিসংঘ মঞ্চে তাঁর উপস্থিতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অবস্থান ও অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার ধারাবাহিকতা তৈরি করে।

এবার সেই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হচ্ছে তৃতীয় প্রজন্ম।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে তিনি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে ভাষণ দেবেন। সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নবযাত্রা, আইনের শাসন, জবাবদিহিতা, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয় স্থান পাবে।

এই বিষয়গুলোর দিকে তাকালেই বোঝা যায়, ১৯৮০ সালের বাংলাদেশের সঙ্গে ২০২৬ সালের বাংলাদেশের বাস্তবতার পার্থক্য কতটা।

জিয়াউর রহমানের সময় আন্তর্জাতিক ন্যায়ের আলোচনায় প্রধান প্রশ্ন ছিল খাদ্য, তেল, বাণিজ্য, উন্নয়ন সহায়তা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য। চার দশক পর সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, কার্বন নিঃসরণ, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল বৈষম্য, জলবায়ু অর্থায়ন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো নতুন বাস্তবতা।

বিশেষ করে জলবায়ু বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ইস্যু।

২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে ‘Climate Action and the Just Transition’ বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী অংশ নেবেন। পরদিন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট অস্তিত্বগত ঝুঁকি নিয়ে জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি উদ্বোধনী বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি নিছক পরিবেশনীতি নয়। উপকূলীয় এলাকার মানুষের বসতি, কৃষি, পানির নিরাপত্তা, জীবিকা এবং অভিবাসনের সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অংশ তুলনামূলকভাবে খুবই কম। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতের ঝুঁকি দেশটির জন্য অনেক বেশি। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা, নদীভাঙন এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি—এসবের সম্মিলিত প্রভাব বাংলাদেশের উন্নয়নকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, শুধু ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। ফলে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ক্ষয়ক্ষতির ন্যায্য দায়বণ্টনের প্রশ্ন বাংলাদেশের কূটনীতিতে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এখানেই ১৯৮০ সালের উন্নয়ন-ন্যায়ের প্রশ্নটি নতুন রূপে ফিরে আসে। তখন প্রশ্ন ছিল দরিদ্র দেশগুলোর জন্য ন্যায্য বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহায়তা নিশ্চিত করা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—যেসব দেশ জলবায়ু পরিবর্তনে তুলনামূলকভাবে কম অবদান রেখেছে, তাদের অভিযোজনের ব্যয় কে বহন করবে এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও অর্থায়ন কীভাবে নিশ্চিত হবে?

প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন সামনে আসছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অবকাঠামো ও নতুন প্রযুক্তি বিশ্ব অর্থনীতির চরিত্র দ্রুত বদলে দিচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তির সুফল সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত নয়। উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষতা, অবকাঠামো ও অর্থায়নে বৈষম্য তৈরি হলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও নতুন ধরনের কেন্দ্র-প্রান্ত সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে। ফলে প্রযুক্তিতে ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকার ও সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দাবি হয়ে উঠছে।

তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফরের আরেকটি বড় বিষয় রোহিঙ্গা সংকট।

২০১৭ সালে মিয়ানমারের সহিংসতার পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। প্রায় নয় বছর ধরে এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশ বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবস্থান করছে। ফলে সংকটটি এখন আর কেবল মানবিক সহায়তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও যুক্ত হয়েছে।

২০২৬ সালে জাতিসংঘ ও সহযোগী সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে ৭১০.৫ মিলিয়ন ডলারের আবেদন জানিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের অবস্থানও দীর্ঘদিন ধরে পরিষ্কার—রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং টেকসই সমাধানও মিয়ানমারেই হতে হবে। প্রত্যাবাসন হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ এবং টেকসই। জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই অবস্থান আবারও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এবারের জাতিসংঘ অধিবেশনের আরেকটি বিশেষ দিক বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানকে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। ২ জুন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তিনি ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ৯৯ ভোট পান। এর মধ্য দিয়ে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর দ্বিতীয় বাংলাদেশি হিসেবে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসীন হয়েছেন।

ফলে একই অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দেশের সরকারপ্রধান হিসেবে সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য দেবেন এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। বাংলাদেশের জন্য এই সমাপতন কূটনৈতিকভাবে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের জাতিসংঘ অধিবেশনকে জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্মের আন্তর্জাতিক উপস্থিতির একটি ধারাবাহিকতা হিসেবেও দেখা যায়।

১৯৮০ সালে জিয়াউর রহমানের সামনে ছিল যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশকে টিকিয়ে রাখা, খাদ্য ও দারিদ্র্যের সংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ন্যায্য অংশীদারি নিশ্চিত করার প্রশ্ন।

১৯৯০-এর দশক ও পরবর্তী সময়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের সময়ে বাংলাদেশের সামনে ছিল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রপরিচয়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে সক্রিয় উপস্থিতির প্রশ্ন।

আর ২০২৬ সালে তারেক রহমানের সামনে রয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বৈশ্বিক বাস্তবতা—জলবায়ু সংকট, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, রোহিঙ্গা সংকট, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কার।

এই তিনটি সময়কে পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—পরিবর্তিত হয়েছে প্রশ্নের ধরন, কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের স্বার্থ ও মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা রয়ে গেছে।

১৯৮০ সালে যে কণ্ঠ বৈশ্বিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে উন্নয়নশীল বিশ্বের ন্যায্য অধিকারের কথা বলেছিল, পরবর্তী সময়ে সেই আন্তর্জাতিক উপস্থিতির ধারাবাহিকতা বহন করেছেন খালেদা জিয়া। এবার সেই ইতিহাসের তৃতীয় অধ্যায়ে প্রবেশ করছেন তারেক রহমান।

তাঁর প্রথম জাতিসংঘ ভাষণ তাই একই সঙ্গে অতীতের উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশার একটি সংযোগস্থল। তবে ২৪ সেপ্টেম্বরের ভাষণ শেষ পর্যন্ত কতটা নতুন নীতিগত দিকনির্দেশনা দেয়, বাংলাদেশের বৈশ্বিক অগ্রাধিকারগুলো কীভাবে উপস্থাপিত হয় এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সেই অবস্থান কতটা কার্যকর সহযোগিতায় রূপ নেয়—সেটিই হবে এই সফরের বাস্তব তাৎপর্য নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

জাতিসংঘের মঞ্চে সেদিন উচ্চারিত হবে বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের প্রশ্নগুলো—গণতন্ত্র, উন্নয়ন, জলবায়ু ন্যায়বিচার, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, প্রযুক্তিতে সমতা, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও একটি কার্যকর বহুপক্ষীয় বিশ্বব্যবস্থা।

জিয়া পরিবারের তিন প্রজন্মের এই আন্তর্জাতিক যাত্রায় তাই ২৪ সেপ্টেম্বর শুধু একটি তারিখ নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসের তিনটি ভিন্ন সময়কে একই বৈশ্বিক মঞ্চে যুক্ত করার একটি মুহূর্ত। অতীতের অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়ে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ কী বার্তা দেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে থাকবে বিশ্ব।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Advertise

Ads

Address

Office : Sheikh Fazlul Haque Moni Stadium (2nd floor), Gopalganj-8100 Mobile: 01712235167, Email: kalerkhabor24.com@gmail.com
© All rights reserved 2022

Design & Developed By: JM IT SOLUTION