কালের খবর ডেক্সঃ
“ট্রেন চালু হচ্ছে, এটা নিঃসন্দেহে ভালো খবর। কিন্তু সময়টা যদি একটু জনবান্ধব হতো, তাহলে গোপালগঞ্জবাসী এর প্রকৃত সুফল পেতেন”। ঢাকা-গোপালগঞ্জ রুটে নতুন ট্রেন সার্ভিস চালুর খবরে এমন প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সোমবার (১০ আগস্ট) থেকে ঢাকা-গোপালগঞ্জ-ঢাকা রুটে যাত্রী পরিবহন শুরু করছে ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ ট্রেন। রাজধানীর সঙ্গে সরাসরি রেল যোগাযোগ চালু হওয়ায় গোপালগঞ্জবাসীর দীর্ঘদিনের একটি প্রত্যাশা পূরণ হতে যাচ্ছে। এতে তুলনামূলক কম খরচে, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যে ঢাকায় যাতায়াতের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছেন সাধারণ মানুষ।
এতদিন সড়কপথে ঢাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে যানজট, সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি, বেশি ভাড়া ও দীর্ঘ সময় ব্যয়ের কারণে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হতো গোপালগঞ্জবাসীকে। নতুন রেল যোগাযোগ চালু হলে এসব দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে বলে মনে করছেন যাত্রী ও স্থানীয়রা।
তবে ট্রেন চালুর আনন্দের পাশাপাশি সময় নিয়েও দেখা দিয়েছে অসন্তোষ। স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়সূচি সাধারণ যাত্রীদের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে অফিস, ব্যবসা, চিকিৎসা ও জরুরি কাজে ঢাকায় যাতায়াতকারীদের জন্য এই সময়সূচি খুব একটা কার্যকর হবে না ব। ফলে যাত্রী কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই কারনে লোকসানও হওয়ার আশংকা করেছেন অনেকে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সোমবার দুপুর ৩টা ১৩ মিনিটে ‘অভিযাত্রী কমিউটার’ ট্রেনটি ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে যাবে। ট্রেনটি গোপালগঞ্জে পৌঁছাবে সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে। একই দিন ফিরতি ট্রেনটি গোপালগঞ্জ থেকে সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে ছেড়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবে এবং রাজধানীতে পৌঁছাবে রাত ১০টা ২৫ মিনিটে।
এই সময়সূচি নিয়ে সদর উপজেলার বোড়াশী গ্রামের বাসিন্দা সঞ্জয় বিশ্বাস বলেন, যে সময়ে ট্রেন চলবে, তাতে শুধু মালামাল বহনেই বেশি সুবিধা হবে। আমরা যারা অফিসিয়াল কাজে ঢাকা যাই, তাদের তেমনে একটা লাভ হবে না। ট্রেনটি সকালে গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছাড়লে মানুষ বেশি উপকৃত হতো।
শহরের থানাপাড়া রোডের বাসিন্দা ইদ্রিস আলী ফকির বলেন, ট্রেন চালু হচ্ছে, এটা খুবই ভালো খবর। কিন্তু সময় যা দেওয়া হয়েছে, তাতে এই রুটে যাতায়াতকারী মানুষের উপকার কম হবে। শুধু মালামাল পরিবহন করে খরচ উঠবে না। লোকসান হলে একসময় এই লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সময় পরিবর্তন খুবই জরুরি।
স্থানীয়দের মতে, গোপালগঞ্জ থেকে সকালে ট্রেন ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে গেলে অফিসগামী মানুষ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী ও চিকিৎসার জন্য ঢাকামুখী রোগীরা বেশি উপকৃত হবেন। আবার দিনের কাজ শেষে সন্ধ্যায় ঢাকায় অবস্থানরত মানুষ গোপালগঞ্জে ফিরতে পারবেন।
তাদের আশঙ্কা, বর্তমান সময়সূচি অনুযায়ী গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী ফিরতি ট্রেন রাত ১০টা ২৫ মিনিটে রাজধানীতে পৌঁছাবে। এতে দূরবর্তী গন্তব্যের যাত্রীদের রাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে হোটেলে থাকা কিংবা স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হতে পারে। পাশাপাশি রাতে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ফলে সাশ্রয়ী রেলযাত্রার উদ্দেশ্য অনেক ক্ষেত্রে ব্যাহত হতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয়দের দাবি, গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকার উদ্দেশে সকালে একটি ট্রেন চালু করা হলে যাত্রীসংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি ট্রেনের আয়ও বাড়তে পারে। এতে একদিকে সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী ভাড়ায় ঢাকায় যাতায়াতের সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে রেলওয়ের জন্যও রুটটি আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এদিকে নতুন এই রেল যোগাযোগ শুধু যাত্রীদের যাতায়াত সহজ করবে না, গোপালগঞ্জের ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে কৃষিপ্রধান এই জেলার কৃষকরা স্বল্প খরচে শাক-সবজি, মাছসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য রাজধানীর বাজারে পৌঁছে দিতে পারবেন। এতে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ বাড়বে এবং কৃষকের আয়ও বাড়তে পারে।
গোপালগঞ্জের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী নড়াইল, পিরোজপুর ও বাগেরহাট জেলার মানুষও নতুন এই রেল যোগাযোগের সুফল পাবেন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, রোগী ও সাধারণ যাত্রীদের জন্য ঢাকায় যাতায়াতের নতুন এই মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকা-গোপালগঞ্জ-ঢাকা রুটে ট্রেন চলাচল শুরু উপলক্ষে এদিন কাশিয়ানী উপজেলার মহেশপুর নতুন রেলস্টেশনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে গোপালগঞ্জ-০১ আসনের সংসদ সদস্য সেলিমুজ্জামান সেলিমের। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে গোপালগঞ্জ-০২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. কে এম বাবরের।
দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হওয়ায় গোপালগঞ্জবাসী নতুন এই ট্রেন সার্ভিসকে স্বাগত জানালেও তাদের প্রত্যাশা, ট্রেনটি যেন শুধু চালু হয়েই থেমে না যায়; বরং মানুষের প্রয়োজন ও সুবিধা বিবেচনায় সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করে নিয়মিত ও টেকসই রেল যোগাযোগ নিশ্চিত করা হয়। এতে গোপালগঞ্জসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের ভোগান্তি কমার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতেও নতুন গতি আসবে বলে মনে করছেন তারা।
Design & Developed By: JM IT SOLUTION