কালের খবরঃ
গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া ইউনিয়নের ডুমুরিয়া উত্তরপাড়া (বাবুপাড়া) গ্রামে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। শান্ত স্বভাবের, পরিশ্রমী ও স্বপ্নবাজ যুবক বুলেট বৈরাগীর (৩৫) মর্মান্তিক মৃত্যু যেন থামিয়ে দিয়েছে একটি সংগ্রামী পরিবারের দীর্ঘ পথচলা। সড়কের পাশে তাঁর রক্তাক্ত নিথর দেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের নীরবতা।
আজ রবিবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বৈরাগী বাড়িতে কান্নার রোল। ছোট টিনের ঘরের সামনে কয়েকটি আমগাছের নিচে বসে আছেন স্বজনরা। কেউ কথা বলতে পারছেন না, কেউবা শূন্য চোখে তাকিয়ে আছেন। বৃদ্ধ দাদি নাতির মৃত্যুতে প্রায় বাকরুদ্ধ। বাড়ির উঠান পরিষ্কার করছিলেন কাকা বিমল বৈরাগী। পাশে আরেক স্বজন অমূল্য বৈরাগী কাঠের বাক্স প্রস্তুত করছিলেন। যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন বুলেট।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বিমল বৈরাগী বলেন, “আমার ভাতিজা জীবনে কাউকে কষ্ট দেয়নি। সেই ছেলেটার লাশ রাস্তায় পড়ে থাকতে হলো! আমরা সব হারিয়ে ফেলেছি।” তিনি জানান, বুলেটের পড়াশোনার জন্য তাঁর বাবা সুশীল বৈরাগী নিজের শেষ সম্বল ২৭ শতক ধানের জমি বিক্রি করেছিলেন। হৃদরোগে আক্রান্ত থাকলেও অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করে ছেলের পড়াশোনার খরচ চালাতেন।
শুধু বাবাই নন, মা লিলিমা বৈরাগীও ছেলের স্বপ্ন পূরণে কখনও পিছপা হননি। নিজের কানের স্বর্ণ বিক্রি করে দিয়েছেন ছেলের শিক্ষার জন্য। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, মা ছেলেকে বলতেন—“তোর বাবা অন্যের জমিতে কাজ করে, এটা কাউকে বলবি না।” কিন্তু বুলেট গর্ব করেই বলতেন—“আমার বাবা কষ্ট করে আমাকে পড়ান, এটাই আমার গর্ব।”
অভাব-অনটনের মধ্যেও নিজের স্বপ্ন ছাড়েননি বুলেট। ছেঁড়া জামা নিজেই সেলাই করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন। বাড়ি ফিরে কাকাকে বলতেন,“আমি নিজেই জামা ঠিক করে পরে ক্লাস করি।” এই দৃঢ়তা ও আত্মসম্মানবোধই তাকে নিয়ে যায় উচ্চশিক্ষা ও চাকরির পথে।
বুলেট বৈরাগী ডুমুরিয়া বহুমুখী উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং গোপালগঞ্জ হাজী লালা মিয়া সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক সম্পন্ন করেন। কর্মজীবন শুরু করেন খাদ্য অধিদপ্তরে। পরবর্তীতে ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার হিসেবে ঢাকা কাস্টমস কার্যালয়ে যোগ দেন। সর্বশেষ তিনি কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে কর্মরত ছিলেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ১১ এপ্রিল প্রশিক্ষণের জন্য চট্টগ্রামে যান বুলেট। প্রশিক্ষণ শেষে শনিবার রাতে কুমিল্লার বাসায় ফিরছিলেন। পথে পরিবারের সঙ্গে কথাও বলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরদিন সকাল ৮টার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে একটি হোটেলের কাছে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে পরিবারের সদস্যরা গিয়ে মরদেহ শনাক্ত করেন। তাঁর মুখমণ্ডলে রক্তাক্ত চিহ্ন দেখা গেছে।
নিহতের স্বজনরা জানান, বুলেটের এক বছর বয়সী ছেলে অভয় রয়েছে। আগামীকাল সোমবার ছেলের প্রথম জন্মদিন উদযাপনের পরিকল্পনা ছিল তাঁর। সেই আনন্দই পরিণত হলো গভীর শোকে।
এদিকে, ঘটনার আগে বুলেটের একটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে রহস্য তৈরি হয়েছে। ২২ এপ্রিল দেওয়া ওই পোস্টে কয়েকজনের মন্তব্য ও পাল্টা মন্তব্য নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
স্থানীয়দের মতে, বুলেট ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও সবার প্রিয় মানুষ। তাঁর এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না গ্রামের কেউই। পাশের চায়ের দোকানে বসে কয়েকজন বলেন, “এত শান্ত ছেলে, তার শত্রু থাকার কথা না। তাহলে কেন এমন হলো?”
গ্রামের সর্বত্র এখন একটাই প্রশ্ন একজন নিরীহ, সংগ্রামী মানুষের এমন পরিণতি কেন? তাঁর অপরাধ কী ছিল?
এ ঘটনায় এলাকায় শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও বিরাজ করছে। স্বজন ও এলাকাবাসী দ্রুত ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
Design & Developed By: JM IT SOLUTION