গোপালগঞ্জের দুই উচ্চ শিক্ষিত সহোদর কুল চাষের মাধ্যমে নিজেদের স্বাবলম্বী করার স্বপ্ন দেখছেন। তাদের উদ্যোগ গোপালগঞ্জে কৃষি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। তারা বর্তমানে আধুনিক কুল চাষের মাধ্যমে স্থানীয় কৃষকদের জন্য একটি মডেল হয়ে উঠেছেন।
কালের খবরঃ
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ভেন্নাবাড়ি গ্রামে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন দুই সহোদর প্রবীর বাকচি ও অপূর্ব বাকচি। উচ্চ শিক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা চাকরির পিছনে না ঘুরে, পৈত্রিক জমিতে উচ্চ ফলনশীল কুল চাষের মাধ্যমে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তারা। আজ, তাঁদের ১৪শ’ কুল গাছ শুধু গ্রামই নয়, পুরো জেলার কৃষি উদ্যোক্তা সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিগত ৫-৬ বছর আগে কৃষির প্রতি আগ্রহের মাধ্যমে তাদের এই উদ্যোগ শুরু হয়। বর্তমানে তারা এই পেশার মাধ্যমে লাখ লাখ টাকার ব্যবসা গড়ে তুলেছেন।
প্রথমদিকে, প্রবীর ও অপূর্ব বিশ্বাস বিভিন্ন ফলের চাষ শুরু করেছিলেন। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেই ফলের চাষ ব্যর্থ হয়ে যায়। এতে তারা হতাশ হয়ে বসে থাকেনি। পরবর্তিতে ইউটিউবের মাধ্যমে কুল চাষে লাভবান হওয়া যায় এমন ভিডিও দেখে উদ্ভুদ্ধ হয়। চাষ পদ্ধতি জানার পর, চুয়াডাঙ্গা থেকে বিভিন্ন জাতের কুলের চারা এনে নিজেদের জমিতে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন। ২০২০ সালে চারা রোপন করে প্রথম বছরেই তারা কুলের আশানুরূপ ফলন দেখতে পায়। এতে তাদের স্বপ্নের পথের প্রথম মাইলফলক স্পর্শ হয়। এখন, কুল গাছগুলিতে ঝুলে রয়েছে ভারত সুন্দরী, কাশ্মিরী আপেল, বল সুন্দরী, থাই আপেল সহ বিভিন্ন জাতের কুল। এবছর কুলের বাম্পার ফলন হয়েছে।

কুলচাষী অপূর্ব বাকচি বলেন, আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। বাবা ছিলেন কাপড় ব্যবসায়ী। অনেক পরিশ্রম করে আমাদের লেখাপড়া শিখিয়েছেন। বেশ কয়েকবার চাকরি পরীক্ষা দিয়েছি। কিন্তু চাকরী নামক সোনার হরিণ ধরতে পারিনি। বয়সসীমা শেষ হওয়ার পর সিধান্ত নেই কৃষি কাজের মাধ্যমে নিজেদের সাবলম্বী করতে। তাই নিজেদের ১২বিঘা ও অন্যের ১০ বিঘা জমি লিজ নিয়ে শুরু করি ফল চাষ। এর মধ্যে একটা পুকুরও রয়েছে। পুকুরে চাষ করা হয়েছে চিংড়িসহ বিভিন্ন জাতের মাছ। পুকুর পাড়ে সবজি, ও জমিতে লাগাই বিভিন্ন জাতের চৌদ্দশ কুল গাছ। এর মধ্যে ৬০০ গাছ প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা যায়। এখন ৮০০ গাছে কুল ধরেছে। এ বছর গাছে যে পরিমান ফল ধরেছে তাতে প্রায় ৪০০মণ কুল উৎপাদন হবে। ইতোমধ্যে প্রায় আড়াইশ মণ কুল বিক্রি হয়েছে। গাছে যে ফল আছে তাতে আরো প্রায় দেড়শমণ কুল বিক্রি করা সম্ভব হবে। আকার ভেদে প্রতিকেজি কুল ৫০ থেকে ২০০টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। গড়ে ১০০টাকা ধরলেও বিক্রি নামবে ১৬ লক্ষ টাকা। ইতোমধ্যে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা বিক্রি নেমেছে। নিজেদের পরিশ্রম বাদে কুল চাষে ব্যয় হয়েছে প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা। খরচবাদে প্রায় ১২/১৩ লক্ষ টাকা লাভ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অপর ভাই প্রবীর বাকচি বলেন, স্থানীয় বাজারে আমাদেও কুলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পাইকার ব্যবসায়ীরা আমাদের ক্ষেত থেকে কুল কিনে নিয়ে জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি করে থাকেন।
তিনি আরো বলেন,আমরা নিজেরাই ক্ষেতের পরিচর্চা করি এবং কুল সংগ্রহ করে সেগুলিকে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করি। আমাদের পরিবারের সদস্যরাও এই কাজে আমাদের সাহায্য করে। এতে কাজের গতি বেড়েছে। তাই আমি বলবো চাকরীর পিছনে না ঘুরে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে আত্মনিয়োগ করলে লাভবান হওয়া সম্ভব।

ভেন্নবাড়ি গ্রামের যুবক শ্যামল কান্তি বিশ^াস বলেন, অপূর্ব ও প্রবীর বাকচি কুল চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পেয়েছেন। আমি তাদের চাষাবাদ দেখে আশা করেছি আগামীতের তাদের মত আমিও চাষাবাদ করবো।
শুধু শ্যামল বাকচি নয় এমন উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন সাতপাড় গ্রামের বাসিন্দা বিমল বিশ^াস, অরবিন্দু সরকার, পাশের সিংগা ইউনিয়নের পংকজ মন্ডল, সাধু মন্ডল, প্রবীর দত্তের সাথে। তারাও এই চাষ সম্পর্কে জানেন এবং নিজেদের কৃষিকাজে সম্পৃক্ত করার ইচ্ছা পোষন করেন।
এ ব্যাপারে গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মামুনুর রহমান জানান, প্রবীর ও অপূর্ব বাকচির কুল চাষের উদ্যোগ স্থানীয় যুবকদের জন্য এক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। দুইভাই কুল চাষ করে ভালো লাভোবান হয়েছেন। তাদেও দেখাদেখি অনেক কৃষক এই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, যাতে তারা উন্নত প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা দিয়ে ভালো ফলন পেতে পারে। তিনি আরও বলেন, এ জেলার কৃষকরা সুষ্ঠু পরিকল্পনা মেনে কুল চাষ করলে, তা শুধু আর্থিক স্বাবলম্বিতা আনবে না, বরং পুষ্টির চাহিদা পূরণেও সহায়ক হবে।
তিনি আরো বলেন,বর্তমানে গোপালগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামে প্রায় ৯০ হেক্টর জমিতে কুলের চাষ হচ্ছে। এই ধারা ধরে রাখলে, অনেক কৃষক লাভবান হতে পারবেন এবং কৃষির মাধ্যমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন।
Design & Developed By: JM IT SOLUTION