রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৭ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
অশুভ শক্তির বিনাশে গোপালগঞ্জের প্রায় পাঁচশ মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে শ্যামাপূজা ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় রাজনৈতিক ঐক্যের ডাক প্রধানমন্ত্রীর নির্মাণকাজ ও গাড়ির কালো ধোঁয়ায় দূষিত ঢাকার অভিজাত এলাকাগুলো মোমের আলোয় প্রয়াত স্বজনদের স্মরণ, গোপালগঞ্জে অনুষ্ঠিত হলো শ্মশান দীপালী উৎসব দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের এশিয়া কাপ ঘিরে সাজছে আনভীর ক্রিকেট স্টেডিয়াম গোবিপ্রবির বিভাগীয় সভাপতি-ডিন পদে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের দায়িত্বে রাখতে চান এমপি বাবর গোপালগঞ্জে নানা আয়োজনে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালিত মুকসুদপুরে ৭৮৫ পিস ইয়াবা ও ৩০০ গ্রাম গাঁজাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে সেলাই মেশিন পেলেন লালমনিরহাটের ১০০ নারী

অশুভ শক্তির বিনাশে গোপালগঞ্জের প্রায় পাঁচশ মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে শ্যামাপূজা

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬, ২.৪৪ পিএম
  • ১৭ Time View
30

গোপালগঞ্জ শহরের বটতলা রোডের রায় বাড়ি  কাশি মন্দিরের শ্যামা মায়ের প্রতিমা। ছবিটি তোলা আজ রবিবার সকালে।

কালের খবর ডেস্কঃ

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম দ্বিতীয় প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী শ্যামা বা কালীপূজা। আজ রবিবার (৮ নভেম্বর) জেলার প্রায় পাঁচশ মন্দির ও পূজামণ্ডপে অনুষ্ঠিত হবে এ পূজা। এদিন সন্ধ্যায় পালিত হবে দীপাবলি বা দীপান্বিতা উৎসব। পূজাকে ঘিরে প্রতিমা তৈরি, মণ্ডপসজ্জা, আলোকসজ্জা ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার প্রস্তুতি ইতিমধ্যে শেষ করেছেন প্রতিমাশিল্পী, আয়োজক ও ভক্তরা।

জেলা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত সর্বজনীন ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে কালীপূজার আয়োজন করা হয়ে থাকে। মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলো এবং আশপাশের এলাকা সাজানো হয়েছে রঙিন আলোয়। অমাবস্যার রাতে প্রদীপের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠবে মন্দির, ঘরবাড়ি ও গ্রামবাংলার জনপদ।

তিথি অনুযায়ী, এ বছর অমাবস্যা শুরু হয় আজ রবিবার (৮ নভেম্বর) সকাল ১১টা ২৭ মিনিটে। আর শেষ হবে আগামীকাল সোমবার দুপুর ১২টা ৩১ মিনিটে। এই তিথির মধ্যেই পূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন আয়োজক ও ভক্তরা। তিথি অনুযায়ী তাই রবিবার রাতেই শেষ হবে শ্যামা মায়ের আরাধনা।

পূজার আয়োজনঃ

গোপালগঞ্জ শহরের সর্বজনীন কেন্দ্রীয় কালীবাড়ি, খাটরা সর্বজনীন কালীবাড়ি, বটতলা রোডের রায় বাড়ি, আমেনা স্কুল রোডের বিজয় বিশ্বাস ওরফে ভোম সাধুর ব্যক্তিগত মন্দির, হীরাবাড়ি রোডের দশআনা কালীবাড়ি এবং কেন্দ্রীয় পৌর শ্মশানের কালিমন্দিরে পূজার আয়োজন করা হয়েছে।

এ ছাড়া কোটালীপাড়া উপজেলা সদরের পশ্চিমপাড় সর্বজনীন কালিমন্দির ও দিঘলিয়া কালিমন্দির, সদর উপজেলার মানিকদাহ সর্বজনীন কালীবাড়ি, উলপুর কালীবাড়ি ও নিজড়া কালীবাড়ি, টুঙ্গিপাড়া পৌর এলাকার সাহাপাড়া সর্বজনীন কালীবাড়ি এবং পাটগাতী সর্বজনীন কালীবাড়িসহ জেলার বিভিন্ন ব্যক্তিগত মন্দির ও মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হবে। সব মিলিয়ে জেলাজুড়ে প্রায় পাঁচশ মণ্ডপ বা মন্দিরে কালীপূজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মনিন্দ্রনাথ বাড়ৈ।

প্রতিমা প্রস্তুতঃ

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার বাজুনিয়া, দুর্গাপুর, কোটালীপাড়ার মাঝবাড়ি, টুঙ্গিপাড়ার রূপাহাটি, মুকসুদপুরের মহারাজপুর, কাশিয়ানীর পালপাড়াসহ বিভিন্ন গ্রামের প্রতিমাশিল্পীরা কালীমাতার প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করছেন। কিছুদিন আগে দুর্গাপূজার ব্যস্ততা সামলে তাঁরা শুরু করেন শ্যামাপ্রতিমা তৈরির কাজ। তবে দুর্গাপূজার তুলনায় কালীপ্রতিমা তৈরির সংখ্যা কম হওয়ায় তেমন বেগ পেতে হয় না তাঁদের। কারণ, বছরের বিভিন্ন সময়ে অমাবস্যা তিথিতে কালীপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তাই চাপটাও কম।

বাজুনিয়া গ্রামের প্রতিমাশিল্পী মানিক পাল ও নৃপেন পাল বলেন, একেকজন পাল তিন থেকে চারটি করে কালীপ্রতিমা তৈরি করছেন। দোমাটির কাজ শেষ করে গতকাল শনিবার রঙের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

শক্তির আরাধনায় শ্যামাপূজাঃ

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী কালী শক্তি, সাহস ও অশুভ শক্তি বিনাশের প্রতীক। হিন্দু পুরাণমতে, দেবী কালী দেবী দুর্গারই এক শক্তিরূপ। সংস্কৃত ‘কাল’ শব্দ থেকে কালী নামের উৎপত্তি। পৃথিবীতে যখন অশুভ শক্তি ও অসুরের অত্যাচার বৃদ্ধি পায়, তখন দেবী কালী আবির্ভূত হয়ে অশুভ শক্তির বিনাশ করেন।

ভক্তদের কাছে দেবী কালী শুধু শক্তির দেবী নন, তিনি মাতৃস্নেহ, মমতা ও বিপদ থেকে রক্ষাকারী পরম আশ্রয়ের প্রতীকও বটে। শ্যামা, আদ্যামা, তারামা, চামুণ্ডা, ভদ্রকালী ও মহামায়াসহ বিভিন্ন নামে তিনি পূজিত হন। এই বিশ্বাসকে ধারণ করে ভক্তরা শ্যামা মায়ের পায়ে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

শহরতলির কারারগাতি গ্রামের বাসিন্দা নারায়ণ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, আমাদের বাড়িতে প্রায় ৩০ বছর ধরে মা কালীর পূজা হয়ে আসছে। আমরা পরিবার, সমাজ ও দেশের মঙ্গল কামনায় মা কালীর কাছে প্রার্থনা করে থাকি। মা আমাদের সব বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন। এবারও সেই আশায় মায়ের পূজার আয়োজন করা হয়েছে। বাড়ির সব পরিবার ও আশপাশের অন্তত পাঁচশ মানুষ মায়ের পায়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে প্রার্থনা করবেন।

পূজার আনুষ্ঠানিকতাঃ

পঞ্জিকা অনুযায়ী, কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে রাতের বিশেষ লগ্নে দেবী কালীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৬ সালে আজ রবিবার পালিত হবে শ্যামা বা কালীপূজা। এর আগের গতকাল শনিবার (৭ নভেম্বর) রাতে পালিত হয় ভূত চতুর্দশী। এদিন অনেক পরিবারে চৌদ্দটি প্রদীপ জ্বালানোর প্রচলিত রীতি পালন করেছে।

আজ রাতে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণ, চণ্ডীপাঠ, পুষ্পাঞ্জলি, আরতি ও প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে। অনেক ভক্ত উপবাস পালন করে রাত জেগে দেবীর আরাধনায় অংশ নেবেন। মন্দিরের পাশাপাশি বিভিন্ন বাড়িতে পারিবারিকভাবেও পূজার আয়োজন করা হয়েছে। তবে কালীপূজা সাধারণত মধ্যরাতে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

শহরের খাটরা সর্বজনীন কালীবাড়ি কমিটির সভাপতি রূপক কুমার বিশ্বাস বলেন, ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী, তিথি মোতাবেক রবিবার রাতে কালীপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অনেক মন্দিরে নতুন করে প্রতিমা তৈরি করে পূজা করা হয়। আবার অনেকে পৌষ বা মাঘ মাসের অমাবস্যা তিথিতে নতুন প্রতিমা তৈরি করে পূজা করে থাকেন। প্রতিমা নতুন না পুরোনো, সেটি কোনো বিষয় নয়; মায়ের পূজা অনুষ্ঠিত হবে। আমরা সেই আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছি।

সর্বজনীন কেন্দ্রীয় কালীবাড়ি কমিটির সভাপতি রমেন্দ্রনাথ সরকার বলেন, মা কালী আমাদের সব অপশক্তি থেকে রক্ষা করেন। এই ধরাধামে যত অন্যায়-অত্যাচার হয়, তা থেকে একমাত্র শ্যামা মা-ই আমাদের রক্ষা করতে পারেন। আমরা মায়ের পায়ে পুষ্প অর্পণ করে দেশের মানুষের কল্যাণ কামনায় প্রার্থনা জানাব।

জেলা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মনিন্দ্রনাথ বাড়ৈ বলেন, জেলায় কতগুলো পূজা অনুষ্ঠিত হবে, তার নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। তবে আজ জেলায় প্রায় পাঁচশ পূজা অনুষ্ঠিত হবে। আর তিথি অনুযায়ী বিভিন্ন মাসে কালীপূজা হয়ে থাকে।

দীপাবলির আলোয় আলোকিত হবে জনপদঃ

কালীপূজার অন্যতম আকর্ষণ দীপাবলি বা দীপান্বিতা উৎসব। অমাবস্যার ঘন অন্ধকারে ঘরবাড়ি, মন্দির ও পূজামণ্ডপে প্রদীপ প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে আলোর উৎসব উদ্‌যাপন করবেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। অনেক পরিবারে সন্ধ্যায় বাড়ি ও শ্মশানে প্রদীপ জ্বালিয়ে প্রয়াত পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজনদের স্মরণে প্রদীপ প্রজ্বালন করা হয়ে থাকে।

কেউ কেউ মাটির প্রদীপ, কোথাও মোমবাতি, আবার কোথাও আধুনিক বৈদ্যুতিক আলোকসজ্জায় সাজানো হবে মন্দির ও পূজামণ্ডপ। অমাবস্যার অন্ধকারে আলোর এই আয়োজন মানুষের মনে নতুন আশা, শান্তি ও কল্যাণের বার্তা ছড়িয়ে দেবে।

দুর্গাপুর ইউনিয়নের কারারগাতি গ্রামের শিক্ষক পবিত্র কুমার বিশ্বাস বলেন, আমাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী কালী শ্মশানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। এ কারণে বিভিন্ন এলাকায় শ্মশানকালী পূজারও আয়োজন করা হয়। কোথাও কোথাও দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে জাঁকজমকপূর্ণভাবে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের মিলনমেলাঃ

গ্রামবাংলায় কালীপূজা শুধু ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। পূজার আয়োজন সফল করতে স্থানীয় মানুষ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ, শ্রম ও বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করেন। তাই তো পূজার পরে বিভিন্ন গ্রামে বসে গ্রামীণ মেলা। মেলায় এলাকাবাসী ও আত্মীয়স্বজন আসেন। কিনে নিয়ে যান বিভিন্ন ধরনের লোকজ জিনিসপত্র।

মানিকদাহ গ্রামের অসীম বালা বলেন, আত্মীয়স্বজনের আগমন, প্রতিবেশীদের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময় এবং প্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে তৈরি হয় আনন্দঘন পরিবেশ। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন। ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’—এ চেতনায় কালীপূজা মানুষের মধ্যে ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে আরও সুদৃঢ় করে।

নিরাপদ উৎসবের প্রত্যাশাঃ

জেলা প্রশাসক মোঃ আরিফ-উজ-জামান বলেন, উৎসবের আনন্দ যেন কোনোভাবেই দুর্ঘটনার কারণ না হয়, সে বিষয়ে সচেতনতা খুবই জরুরি। প্রদীপ ও মোমবাতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা, বৈদ্যুতিক সংযোগ পরীক্ষা এবং পূজামণ্ডপে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে আয়োজকদের বলা হয়েছে। পাশাপাশি আতশবাজি ও উচ্চ শব্দের মাইক ব্যবহার পরিহার করে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা এসব বিষয়ে কাজ করছি। আশা করি, শান্তিপূর্ণভাবে কালীপূজার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রদীপের আলোয় আলোকিত হোক প্রতিটি ঘর, দূর হোক মানুষের মনের অন্ধকার। সমাজ থেকে অন্যায়, হিংসা, বিদ্বেষ ও বৈষম্য দূর হয়ে প্রতিষ্ঠিত হোক শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিকতা—এমন প্রত্যাশা নিয়েই এবার গোপালগঞ্জে উদ্‌যাপিত হবে শ্যামাপূজা।

 

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Advertise

Ads

Address

Office : Sheikh Fazlul Haque Moni Stadium (2nd floor), Gopalganj-8100 Mobile: 01712235167, Email: kalerkhabor24.com@gmail.com
© All rights reserved 2022

Design & Developed By: JM IT SOLUTION