কালের খবর ডেক্সঃ
শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে গোপালগঞ্জজুড়ে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে চলছে প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপ সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও নানা আয়োজনের প্রস্তুতি। দেবী দুর্গার আগমনের প্রতীক্ষায় দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমাশিল্পী, কারিগর ও পূজা উদযাপন কমিটির সদস্যরা।
গোপালগঞ্জ শহরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার মন্দির ও পূজামণ্ডপে এখন চলছে দেবী দুর্গা ও তাঁর সঙ্গীদের প্রতিমা নির্মাণের কাজ। অধিকাংশ প্রতিমার খড়ের কাঠামো ও মাটির কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন চলছে মাটির শেষ লেপন। এরপর রং-তুলির আঁচড়ে প্রতিমাগুলো পাবে পূর্ণাঙ্গ রূপ। একই সঙ্গে মণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা এবং পূজার আনুষঙ্গিক প্রস্তুতিতেও ব্যস্ত আয়োজকেরা।
এ বছর গোপালগঞ্জ জেলায় ১ হাজার ২৮৮টি মন্দির ও মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।এর মধ্যে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলায় ৩৫০টি, কাশিয়ানীতে ২২৬টি, কোটালীপাড়ায় ৩১৫টি, মুকসুদপুরে ৩০৭টি এবং টুঙ্গিপাড়ায় ৯০টি স্থায়ী ও অস্থায়ী মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে।
দেবীর আগমনের মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় তাই দিন-রাত এক করে প্রতিমা তৈরিতে ব্যস্ত শিল্পীরা। দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতী, গণেশ ও কার্তিকের প্রতিমা নির্মাণের পাশাপাশি প্রতিমার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষঙ্গ ও পৌরাণিক দৃশ্যপটও ফুটিয়ে তুলছেন তাঁরা।
প্রতিমাশিল্পীরা জানান, এ বছর প্রত্যেকে গড়ে চার থেকে ছয়টি করে প্রতিমা তৈরি করছেন। প্রতিটি প্রতিমা তৈরিতে মজুরি হিসেবে নেওয়া হচ্ছে সর্বনিম্ন ৬০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত। পূজার আগেই প্রতিমা নির্মাণ, রং ও সাজসজ্জার সব কাজ শেষ হবে বলে জানান তাঁরা।
সাতক্ষীরা জেলা থেকে গোপালগঞ্জে প্রতিমা তৈরির কাজে আসা ভাস্কর্য শিল্পী প্রকাশ পাল বলেন, এ বছর গোপালগঞ্জে দুটি এবং বাগেরহাটে একটি মন্দিরের প্রতিমা তৈরির কাজ নিয়েছি। আমার টিমে পাঁচজন ভাস্কর্য শ্রমিক রয়েছে। তাঁদের মজুরি ও খাবার খরচ বাদ দিলে হাতে তেমন কিছুই থাকে না। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে চলতে খুবই কষ্ট হয়। এই পেশা টিকিয়ে রাখতে আমরা সরকারের কাছে মাসিক ভাতার দাবি জানাই। তা না হলে একদিন এই শিল্প দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
ভাস্কর্য শ্রমিক হৃদয় দাস বলেন, আমরা দাস বংশের লোক। পাল মহাশয়ের সঙ্গে কাজ করে যে মজুরি পাই, তা দিয়েই আমাদের পরিবারের ভরণপোষণ চলে। প্রতিমা তৈরির কাজে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। কিন্তু সেই অনুযায়ী মজুরি পাই না।
গোপালগঞ্জের বাজার যুব সংঘের আয়োজক দিলীপ কুমার সাহা দিপু বলেন,বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি দুর্গাপূজা আয়োজন করতে প্রায় ১৫ লাখ টাকা খরচ হয়। সবকিছুরই মূল্য বেড়েছে। শুধু প্রতিমা তৈরিতেই প্রায় ২ লাখ টাকা প্রয়োজন। লাইটিং ও পূজার সামগ্রী কিনতেও বেশ খরচ হয়। তারপরও আমরা ৬০ বছর ধরে এই পূজা চালিয়ে আসছি। আশা করি, সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সাড়ম্বরে পূজা উদযাপন করতে পারব। প্রশাসনের কাছে আমাদের একটাই প্রত্যাশা কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম যেন না হয়।
গোপালগঞ্জ শহরের খাটরা সর্বজনীন কালীবাড়ির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক উজ্জ্বল বিশ্বাস বলেন,সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। এই উৎসব যাতে আমরা যথাযথ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দের মধ্য দিয়ে পালন করতে পারি, সে জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করছি।
খাটরা সর্বজনীন কালিবাড়ি কমিটির সভাপতি রূপক বিশ্বাস বলেন,ধর্মীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী, আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার আগমনের ক্ষণগণনা শুরু হবে। এরপর ১৭ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হবে শারদীয় দুর্গোৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে দেবীর আরাধনা ও প্রতিমা বিসর্জনের আয়োজন।
তিনি আরো বলেন,এবার দেবী দুর্গার আগমন হবে ঘোটকে বা ঘোড়ায় এবং গমন হবে নৌকায়। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস ও পঞ্জিকামতে, ঘোটকে দেবীর আগমনকে ঘিরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কার কথা বলা হয়। অন্যদিকে নৌকায় দেবীর গমনকে শুভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে শস্য-শ্যামলা, শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রত্যাশা করছেন ভক্তরা।
সিকদারপাড়া পূজা মন্ডপের আয়োজক পংকজ সিকদার বলেন, দেবীর আগমনে অশুভ শক্তির বিনাশ, শান্তি, মঙ্গল ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার প্রার্থনায় ইতোমধ্যেই প্রস্তুত হচ্ছে গোপালগঞ্জের পূজামণ্ডপগুলো।এবারের পূজাকে আরও উৎসবমুখর করে তুলতে আলোকসজ্জা, প্রসাদ বিতরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট গোপালগঞ্জ জেলঅ শাখার সভাপতি অশোক বিশ্বাস বলেন, মন্ডপ সাজানো থেকে শুরু করে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ব ও সৌহার্দ্যের বন্ধন অটুট রেখে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপিত হবে এমন প্রত্যাশা আমাদের।
গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মোঃ হাবীবুল্লাহ বলেন, জেলার সব পূজামণ্ডপে পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি এসআরবি, আনসার ও গ্রাম পুলিশ সদস্যরা নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবেন। এর সঙ্গে মণ্ডপ কমিটির পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবকরাও দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে পূজার সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবে।
জেলা প্রশাসক মোঃ আরিফ-উজ-জামান বলেন, গোপালগঞ্জ জেলা শান্তিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো। পূজামণ্ডপ ও উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলাসহ সার্বিক বিষয় মনিটরিংয়ের মধ্যে রাখা হয়েছে। উৎসবের সময় ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক টহল দল দায়িত্ব পালন করবেন। আশা করি, অত্যন্ত উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে গোপালগঞ্জে শারদীয় দুর্গোৎসব সম্পন্ন হবে।
দেবী দুর্গার আগমনী বার্তায় তাই গোপালগঞ্জের পূজামণ্ডপগুলোতে এখন সাজ সাজ রব। প্রতিমায় প্রাণের স্পর্শ, মণ্ডপে আলোর ঝলকানি আর ভক্তদের প্রার্থনায় মুখরিত হয়ে উঠছে জনপদ। অশুভের বিনাশ ও শুভশক্তির প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবের আনন্দে শারদীয় দুর্গোৎসবকে বরণ করতে প্রস্তুত গোপালগঞ্জবাসী।
Design & Developed By: JM IT SOLUTION