কালরে খবরঃ
গোপালগঞ্জের মধুমতি নদীতে জেগে ওঠা চর ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে “মিনি কক্সবাজার” হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। গোপালগঞ্জসহ আশপাশের জেলা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার ভ্রমণ পিপাসু মানুষের ভীড়ে সরগরম স্থানটি। শুক্র ও শনিবার দর্শণার্থীদের ভীড় দেখলে যে কেউ এটাকে কক্সবাজার মনে করতেই পারেন। আর সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে মুহূর্তেই এই স্থানটি এখন ভাইরাল “মিনি কক্সবাজার” এ পরিনত হয়ে পড়েছে।
মধুমতি নদীর পূর্বপাড়ে গোপালগঞ্জ আর পশ্চিম পাড়ে নড়াইল জেলা। দুই জেলার মাঝ দিয়ে বয়ে চলা মধুমতি নদীর মাঝ বরাবর জেগে ওঠা প্রায় তিনশ মিটার দৈর্ঘ ও চল্লিশ মিটার প্রস্থের বিশাল চরটি এখন শুধু দুই জেলার বাসিন্দাদের জন্যই নয়, আশপাশের জেলার বাসিন্দাদের জন্য এটি একটি পর্যটন এলাকা হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন সকাল থেকে সূর্য ডোবার আগ মূহুর্ত পর্যন্ত হাজার হাজার পর্যটকের আনাগোনা থাকে এখানে। “মিনি কক্সবাজার” বললেই যে কেউ এলাকাটিকে দেখিয়ে দিতে পারবে। গোপালগঞ্জ জেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে জালালাবাদ ইউনিয়নের চর মাটলা খেয়াঘাটের পাশে মধুমতি নদীতে এই চর জেগে উঠেছে।
মধুমতি নদীর স্বচ্ছ নীল জলরাশি ভেদ করে জোয়ারের সময় ডুবন্ত আর ভাটির সময় জেগে ওঠা এই বিশাল চর পর্যটন স্পটে রূপ নিয়েছে। এখানকার মানুষজনই শুধু নয়, দূর থেকে আসা পর্যটকেরাও মধুমতির এই জেগে ওঠা চরটিকে এখন “মিনি কক্সবাজার” হিসেবেই অভিহিত করেছেন। এখানে বেড়াতে আসা লোকজন বা নদীর মাঝখানে চরে ঘুরে বেড়ানো, ফুটবল খেলা এক অন্যরকম অনুভূতি এনে দেয়। এছাড়া নদীর স্বচ্ছ জলে গা ভেজানো সত্যিই আনন্দের। তাছাড়া যারা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে যেতে পারে না, তাদের জন্য এটি একটি ভালো বেড়ানোর জায়গা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
এলাকাটিতে লোকজনের আনাগোনা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইতোমধ্যে অসংখ্য ভাসমান দোকান বসেছে। স্থানীয়রা দোকান বসিয়ে বেচাকেনা করে বেশ লাভবান হচ্ছেন। তেমনি মানুষ পারাপারে ট্রলার মালিকেরাও বেশ রোজগার করছেন। আর স্বেচ্ছাসেবকেরা বেড়াতে আসা লোকজনকে সাহায্য সহযোগিতা করে কিছু আয় করছেন। স্থানীয়ভাবে দর্শনার্থীদের দেয়া হচ্ছে নিরাপত্তা। সব মিলিয়ে এখানে আসা পর্যটকরা খুশি। স্বল্প খরচে অনেক বেশি আনন্দ উপভোগের জন্য এ স্থানটি দর্শনার্থীদের কাছে ইতোমধ্যে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে। অপ্রিতিকর ঘটনা এড়াতে সার্বক্ষনিক তদারকির জন্য ইতোমধ্যে একটি স্বেচ্ছাসেবক কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার সৈকত মোল্লা বলেন, ফেসবুকে ভিডিও দেখে দুই বন্ধু এখানে এসেছি। যা শুনেছিলাম তার চেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছি। অনেক ভালো লেগেছে। কম খরচে একটা ভালো আনন্দ উপভোগ করলাম। তবে, এখানে যদি নারীদের পোশাক পরিবর্তনের ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে আরো ভালো হবে। এতে নারী পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।
নড়াইল জেলার লোহাগড়া প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ শ্যামল চন্দ্র রায় সস্ত্রীক ঘুরতে আসেন এখানে। স্থানটি সত্যিই সুন্দর। আমরা ঘুরে আনন্দ উপভোগ করছি। পাশে সবুজ ক্ষেত। সেখানেও ছবি তুলেছি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করলাম। ভালোই কাটলো বিকালটা।

স্থানীয় চর মাটলা গ্রামের দিদারুল ইসলাম সমাজদার বলেন, জেগে ওঠা চরটির পশ্চিমপাড়ে নড়াইল জেলার পাংঙ্খারচর, লংঙ্কারচর আর পূর্বপাড়ে চর মাটলা সহ বেশ কয়েকটি গ্রাম রয়েছে। গত বছর ছোট একটা চর দেখতে পাই। কিন্তু এবছর সেই চরটি প্রায় ১০গুন বড় হয়েছে। তিনি আরো জানান, জোয়ার-ভাটার উপর নির্ভর করে চর জেগে ওঠে আবার পানিতে ডুবে যায়। সাধারণত সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এই চরের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।
দক্ষিণ ফুকরা গ্রামের মোঃ ইখলাস আলী বলেন, ৮/১০দিন হলো এখানে মানুষের ভীড় বেড়েছে। আমি পিয়াজুর দোকান দিয়ে দিনে তিন চার হাজার বিক্রি করছি। কেনাবেচা মোটামুটি ভালো। আগামীতে আরো ভালো আশা করছি।
গোপীনাথপুর খন্দকার শামস উদ্দিন নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী সাফায়েত সমাজদারের ছেলে আব্দুল মাহিন সমাজদার বলেন, এখন স্কুল বন্ধ। তাই বাড়ি থেকে সবজি রোল তৈরী করে এখানে এনে বিক্রি করি। দিনে ৫/৬শ টাকা ইনকাম হচ্ছে। আমার মতো আরো অনেকে আছে, তারাও পড়াশোনার পাশাপশি ব্যবসা করছেন। তবে, আগামীতে এখানে একটি ভালো পর্যটন গড়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় মীরার চরের তোরাব শেখের ছেলে রাজু শেখ বলেন, সপ্তাহ দু’এক আগে আমি প্রথমে এই চরের দৃশ্য মোবাইলে ধারণ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করি। এরপর অনেকেই পোস্ট করেছে। আর ভাবেই মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় স্থানটি। এখন প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসছে। কিছু মানুষ ব্যবসা বানিজ্য করে আয় করছেন। এতো স্থানীয়রা বেশ লাভবান হচ্ছে।
নদীর পার থেকে চর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া ট্রলার মাঝি মোঃ ইয়াসিন মোল্লা বলেন, এখানে প্রতিদিনই হাজার হাজার পর্যটক আসছেন। আমরা পর্যটকদের কাছ থেকে জনপ্রতি ২০ টাকা করে নেই। এর বিনিময়ে ওইখানে নামিয়ে দিয়ে আসি আবার নিয়ে আসি। এতে পর্যটকরা আমাদের উপর খুশি।

স্থানীয় মোঃ সুমন আহম্মেদ বলেন, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মাটলা চরপাড়া খেয়াঘাট এলাকায় মধুমতি নদীর মাঝখানে একটি বিশালাকৃতির চর পড়ার বিষয়টি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার পর এখানে প্রচুর সংখ্যক দর্শনার্থী আসছেন। গোপালগঞ্জ, নড়াইল, বাগেরহাট, ফরিদপুর, মাগুরা, সাতক্ষীরা, যশোর, ঝিনাইদাহ, কুষ্টিয়া সহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আসা দর্শনার্থীর সংখ্যা প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া শুক্র ও শনিবার দর্শনার্থীদের প্রচুর চাপ থাকে। যেহেতু এটি একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল, তাই বাইরে থেকে আসা দর্শনার্থীদের চরে যাওয়ার জন্য নৌকার ব্যবস্থা, তাদের মোটর সাইকেল বা যান বাহন রাখার ব্যবস্থা করা সহ প্রয়োজনীয় খাদ্য দ্রব্যের জন্য কিছু স্থানীয়রা দোকানপাট বসিয়েছে। দর্শনার্থীদের সাথে যাতে নির্বিঘেœ এখানে আসতে পারেন এবং আনন্দ উপভোগ করতে পারেন তার জন্য আমরা যুবকরা স্বেচ্ছাশ্রমে তাদের সহযোগিতা করছি। এখানে জন প্রতি ২০ টাকায় নৌকায় করে চরে গিয়ে আনন্দ উপভোগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া মোটর সাইকেল রাখার জন্য দিতে হয় ২০ টাকা। আর ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের গোপীনাথপুর, গোপীনাথপুর উত্তরপাড়া, গোপীনাথপুর শরীফপাড়া, চন্দ্রদিঘলিয়া যে কোন বাসস্ট্যান্ডে নেমে ইজিবাইক বা ভ্যানে করে যেতে জন প্রতি ৩০/৪০ টাকা খরচ হয়। গোপালগঞ্জ আসার পর সর্বমোট এক জন মানুষ মাত্র ১০০ টাকা খরচ করে এ আনন্দ উপভোগ করতে পারবেন।
গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা প্রকৌশলী কাজী মাহমুদ উল্লাহ বলেন, এখানে আসার রাস্তার অবস্থা ভালো। তবে, শেষাংশে সামান্য একটু রাস্তার অবস্থা খারাপ। যদিও ওই অংশের কাজের টেন্ডার হয়েছে। দ্রুতই কাজ শেষ হবে।
এ ব্যাপারে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার কৌশিক আহম্মেদ বলেন, আমরা কয়েকদিন ধরে লক্ষ্য করছি গোপালগঞ্জ সহ আশপাশের বেশ কয়েকটি উপজেলার মানুষ এটিকে বেশ আনন্দের সাথে নিয়েছেন। আনন্দ উপভোগ করার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে আসছে। এটি তাদের কাছে কক্সবাজারের একটা অনুভূতি পাওয়ার মতো অবস্থা রয়েছে। তারা নদীর মাঝখানে যাচ্ছে নৌকায় করে। সেখানে গোসল করছে। যারা কক্সবাজারে যেতে পারে না তারা এখানে কক্সবাজারের স্বাদটা উপভোগ করার চেষ্টা করছে ।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জায়গাটি ভিজিট করলাম। এখানে যারা পর্যটকরা আসছে, যেহেতু এটি একটি নদী, এখানে আসা অনেকে সাঁতার জানেন না। তাদের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য আমরা উদ্যোগ নিবো। কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে এই জায়গাটিকে সুরক্ষিত করাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে। আর যে সকল ভ্রমণপিপাসু মানুষ এখানে আসছেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আমরা সচেষ্ট থাকবো।#
Design & Developed By: JM IT SOLUTION